রবিবার , ২১ জানুয়ারি ২০১৮
শিরোনাম

সমবায়ে অবাধে চলছে অবৈধ ব্যাংকিং

images(2)              by editor: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা উদ্যোগের পরও থামছে না সমবায়ের নামে অবৈধ ব্যাংকিং। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সমবায়ের আড়ালে ব্যাংকিং করছে। এরমধ্যে ১১৩টি শাখা খুলে পুরোদমে ব্যাংকিং করছে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ সোসাইটি এবং ১১০টি শাখার মাধ্যমে ব্যাংকিং করছে আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) আজিজ কো-অপারেটিভ বিষয়ে ব্যাপকভাবে তদন্ত করছে।  এর আগে গত ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে ওই সভায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের কার্যালয় (রেজসকো), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও সমবায় অধিদফতরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।  এ প্রসঙ্গে বিএফআইইউর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আজিজ কো-অপারেটিভ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন না নিলেও ঠিকই তারা ব্যাংকিং করছে। একইভাবে মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভও পুরোদমে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি কিছু অনিয়মও বিএফআইইউর তদন্তে ধরা পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ও আজিজ কো-অপারেটিভের ব্যাংকিং করার বিষয়টি ধরা পড়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সমবায় অধিদফতরকে বলা হয়েছে। বিষয়টি সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।’ তিনি জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভায় এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সমবায় অধিদফতরকে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আলাদাভাবেও বাংলাদেশ ব্যাংক অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সরকারও কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী মিটিংয়ে এ নিয়ে আলোচনা হবে।   এর আগে চলতি বছরের মাঝামাঝি আজিজ কো-অপারেটিভ নামের প্রতিষ্ঠানটি বিনা অনুমোদনে সারাদেশে ১১০টি শাখা খুলে অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বরাবর পাঠানো একটি অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।   সমবায় থেকে অনুমোদন নেওয়া এসব প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত না হওয়ায় এদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও ব্যবস্থা নিতে পারে না বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও সমবায় সমিতি আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘ব্যাংক’ হিসেবে লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষ থেকে আমানত গ্রহণ বা ঋণ বিতরণ করতে পারে না। কেবলমাত্র সদস্যদের মধ্যে কাজ করার জন্য কো-অপারেটিভের একটির বেশি শাখা থাকতে পারবে না। অথচ ঢাকা মার্কেন্টাইল বর্তমানে ১১৩টি এবং আজিজ কো-অপারেটিভ ৯৭টি শাখার মাধ্যমে সারাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর ব্যাংকের মতোই সব ধরনের গ্রাহক থেকে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ করছে।  যদিও এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জনসাধারণকে দূরে থাকতে একাধিকবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্কতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।  এদিকে, আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ক্রেডিট সোসাইটির অবৈধ ব্যাংকিং বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কোনও ধরনের ব্যাংকিং না করতে গত ২২ মার্চ কয়েকটি পত্রিকায় সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। তবে এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রচারকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারবহির্ভূত উল্লেখ করে গত ২৭ মার্চ আদালতে রিট দায়ের করে প্রতিষ্ঠানটি।  এ প্রসঙ্গে সমবায় অধিদফতরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক আবদুল মজিদ জানান, আদালতে রিট দায়েরের পর থেকে সমবায় অধিদফতরকে তদারকিতে কোনও সহায়তা করছে না আজিজ কো-অপারেটিভ। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির বেআইনি কার্যক্রম বন্ধের জন্য বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ সোসাইটির অবৈধ ব্যাংকিংয়ের বিষয়ে দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্য প্রধান কার্যালয়সহ কয়েকটি শাখা পরিদর্শন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর তাদের সঙ্গে ব্যাংকিং না করার বিষয়ে একাধিকবার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সমবায় অধিদফতরকে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এরপর সমবায় অধিদফতর থেকে ব্যবস্থা নিতে গেলে আদালতে রিট করে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে আমানত ছিল এক কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ ছিল ৫৩ লাখ টাকা। অথচ ২০১৫ সালে এসে এর আমানত ৯৮১ কোটি ও বিনিয়োগের পরিমাণ এক হাজার ৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সে হিসেবে সমিতির আমানত ৯১৬ গুণ ও বিনিয়োগ দুই হাজার ৩৬ গুণ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানের উপ-বিধির ১৮ ধারা অনুযায়ী প্রতি সদস্যের অনুকূলে ন্যূনতম ১০০ টাকার শেয়ার বিতরণ করলেও সর্বনিম্ন শেয়ার মূলধন ২০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, এতে সুস্পষ্ট প্রমাণিত যে, প্রতিষ্ঠানটি সদস্যবহির্ভূত সাধারণ গ্রাহক থেকেও ব্যাংকের মতো আমানত সংগ্রহ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে আরও বলা হয়, এসব আমানতের বেশিরভাগই দীর্ঘমেয়াদি আমানত প্রকল্পের মাধ্যমে সংগৃহীত। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আমানত বৃদ্ধির হার প্রায় ২৬ শতাংশ। পাঁচ বছরে আমানত বৃদ্ধির হার প্রায় ১২০ শতাংশ– যা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধির হারের তুলনায় অস্বাভাবিক। প্রতিষ্ঠানটির এই আগ্রাসী আমানত সংগ্রহ কার্যক্রম বন্ধ করা না গেলে উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের আমানত ঝুঁকিগ্রস্ত হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ওঠে এসেছে।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes