রবিবার , ২১ জানুয়ারি ২০১৮
শিরোনাম

২৮ অক্টোবর’০৬ ও নতুন প্রজন্মের প্রতিজ্ঞা

২৮ অক্টোবরে ২০০৬ সালে সারাদেশে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় সংঘটিত ঘটনাগুলোর স্মৃতি আমাদের জন্য খুবই বেদনা বিদূর, দুঃসহ, অমানবিক, অকল্পনীয় ও অচিন্তনীয়। ওই দিনের ঘটনাটি স্মৃতিচারণ করে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কি অপরাধে সেদিন বাংলাদেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরকে হত্যা করা হলো? যারা এই অপকর্ম করেছে এদের আমরা কখনও মানুষতো দূরের কথা কিযে বলে অভিহিত করবো তা আমার জানা নেই, পশুও নিঃসন্দেহে নিজেদের হিংসা চরিতার্থ করার জন্য এরকম কাজ করতে পারেনা । কিন্তু এরপরও মানুষরুপী এই হিংস্র প্রাণিগুলো বাংলাদেশে বসবাস করছে এবং নিজেদেরকে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।

নতুন প্রজন্মের কাছে এসব মানষরুপী প্রাণিদের আসল পরিচয় তুলে ধরার জন্য যেমন প্রয়োজন অতীতের এই দুঃখজনক ঘটনার স্মৃতিচারণের, পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন এই হিংস্র প্রাণীদেরকে মানুষ বানানোর জন্য আমাদের পক্ষ হতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ আমরা নতুন প্রজন্ম, আমাদের জীবন দিয়ে হলেও বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে চাই। এরকম ঘটনা যারাই ঘটিয়েছে ইতিহাসে তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজদৌলার আপাত পরাজয় আর মীরজাফরের সাময়িক জয়লাভ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু ইতিহাসের মানদন্ডে সিরাজদৌলাকে আমরা দেখি নায়কের ভূমিকায়।

সাময়িক ক্ষমতার লোভে যারা অন্ধ, তাদেরকে ইতিহাস আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে, এটিই পৃথিবীর ইতিহাসের চিরন্তণ বাস্তবতা।
আসলে আমাদের প্রিয় দেশটাকে গড়ার জন্য আমরা ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে পারিনি, যা আমাদের জন্য অনেক বেশী দুঃখজনক ব্যাপার। আমাদের কারও প্রতি কোন ক্ষোভ থাকা উচিত নয়, একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা সবাই মিলে একসাথে কাজ করতে চাই। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে প্রকাশ্যে দিনে দুপুরে লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হল তা যেকোন বিবেকবান মানুষ সহ্য করতে পারেনা। এ ঘটনাগুলো কারা, কিভাবে ও কেন ঘটিয়েছে তা জাতির কাছে পরিস্কার। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা লাল সবুজের একটি পতাকা পেয়েছি। আমাদের মধ্যে কেন এত প্রতিহিংসা থাকবে? সত্যিকার অর্থে আমরা এখনও মানুষ হতে পারিনি। স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিকই কিন্তু সোনালী বাংলাদেশ গড়ার জন্য যেধরণের মানুষ প্রয়োজন তা আমরা হতে পারিনি।

অতীতের সকল কলুষ কালিমা মুছে আমরা নতুন প্রজন্ম সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে আমাদেরকে অবশ্যই ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে কাজ করতে হবে। যিনি প্রকৃত অর্থে দেশ পরিচালনায় সবচেয়ে যোগ্য ও সৎ বলে বিবেচিত হবেন তাকেই আমরা দেখতে চাই বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে। আমরা বাংলাদেশকে পৃথিবীর কাছে আদর্শ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এজন্য নতুন প্রজন্মের তরুন যুবকদের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা মানবতার কল্যাণে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে চাই। আমাদের জনসংখ্যাকে সত্যিকার অর্থে জনসম্পদে রুপান্তরিত করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি সোনালী সভ্যতা বিণির্মান করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে চাই। সুন্দর একটি সোনালী সমাজ বিণির্মানের লক্ষ্যে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আদর্শ মানুষ হতে হবে।

আজকে বাংলাদেশের চরম বাস্তবতা হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে আদর্শ মানুষরুপে গড়ার জন্য দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি ও কর্তা ব্যক্তিদের তেমন কোন প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে। যাদের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা তারা গড়ার পরিবর্তে নতুন প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই নতুন প্রজন্মকে, নিজেকে গড়ার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের ভালোভাবে জানা অতীব জরুরী। কোন প্রকার ব্যক্তিপূজা বা দলীয় দৃষ্টিকোণ হতে ইতিহাস জানার চেষ্টা করলে কোনভাবেই আমরা স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারব না। স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষের ধোয়া তোলে একটি কূচক্রী মহল জাতীকে বিভক্ত করার এক হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে যা আমাদের জাতীয় ঐক্যের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক, একথা নতুন প্রজন্মকে খুব ভালভাবে বুঝতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পটভূমি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সংঘটিত সব ঘটনা নতুন প্রজন্মকে নিরপেক্ষ মন মানসিকতা নিয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে বিচার করতে হবে। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা পরবর্তী সংঘটিত সব ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য খুবই জরুরী।
দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের খুব কম মানুষই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানে, আসলে বলতে গেলে বলতে হয় জানার সূযোগই পায়নি। আরও অবাক করার বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের এক শ্রেণীর তথাকথিত বুদ্ধিজীবি তাদের নিজেদের প্রয়োজনে অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে দিচ্ছে না, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে। যেকারণে নতুন প্রজন্ম না বুঝে অনেকটা অন্ধের মত দিশেহারা হয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস জানছে।

পুরাতনকে আমরা আর আকড়ে থাকতে চাইনা, আমরা আর বাংলাদেশের দুঃখজনক ঘটনাগুলোর পূণরাবৃত্তি চাইনা। চাইনা ২৮ অক্টোবর’০৬ সালের মত ইতিহাসের এক লোমহর্ষক ঘটনার পূণরাবৃত্তির। চাই ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আগামী দিনের সুন্দর আলো ঝলমলে আলোকিত একটি বাংলাদেশ – এটিই হোক নতুন প্রজন্মের প্রতিজ্ঞা।

কলামিষ্ট- ডা. মু. মুজাহিদুল ইসলাম

 

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes