সোমবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
শিরোনাম

অজান্তেই চোখে জল ? একটি পর্যালোচনা

yy

আসছিলাম কুমিল্লা থেকে . . . .

আমি তোমার কাছে কিছুই চাই না। শুধু দিনে একবার অন্তত কথা বলো। তা না হলে আমি  বাঁচতে পারবো না। তোমার আমার জন্য কিছুই করতে হবে না, আমি তোমাকে খাওয়াব,পরাবো। শুধু আমার সাথে থেকো। জানো আজ সারাদিন আমি এক গ্লাস পানি ছাড়া কিছুই খাইনি। বাড়িতে ভাইয়া,বাবা,মা কেউ জানেনা। আমি এখন গাড়িতে। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথাগুলি বলছিল আঠার,বিশ বছরের মেয়েটি। আড় চোখে তাকিয়ে দেখি চোখ দুটি ফোলা ফোলা। মাথার চুলগুলো অগোছাল। দেখতে খুব সুন্দর না হলেও মোটামুটি ভাল। চোখে চশমা,পরনে কাল বোরকা। অবস্থা দেখে মনে হল উচ্ছৃংখল না হলেও আধুনিকা তবে এখনও যথেস্থ বাবা-মায়ের ছায়া আছে।চোখে মুখে বিষন্নতার ছাপ।

কুমিল্লা থেকে ঢাকা আসার পথে আমার পিছনের ছিটে ছিল আপুটির অবস্থান। মন চাইছিল কষ্টের কথাগুলি শুনি কিন্তু আমার নামার আগেই যে নেমে গেল জুরাইনে…..। আমি জানিনা মেয়েটি তার স্বতিত্ব হারিয়েছে কিনা? তাদের সম্পর্ক কতদুর পর্যন্ত গিয়েছে? জানিনা সামনের পৃথিবীতে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে???

এটি আসলে সমাজের একটি বাস্তব চিত্র মাত্র। সম্পর্কহীন একটা ছেলে-মেয়ে খুজতে হয়তো এখন ভাইনোকুলার গ্লাস লাগবে।

ভাবছিলাম যুবসমাজের এ অধঃপতন কেন? কেন সাংস্কৃতি অঙ্গন থেকে শিক্ষাংগন আজ অসামাজিক কাজের ছয়লাব? কেন দিনে দিনে পরিনত হচ্ছি একটা বিকৃতি,ধিকৃত সমাজে? ভালবাসতে হবে ঠিক আছে কিন্তু ভালবাসা আজ এমন কেন? কেন প্রতারিত হচ্ছে দিনদিন? কেন নিরন্তর পথে ঘাটে,বাস-পার্কে এতো ধিকৃত মানুষের পরিচয়। জাতির বিশ্বাস আর মেরুদন্ড হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কেন আাজ নোংরামির ছড়াছড়ি? লেখাপড়া কেন আজ আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ আর আত্নমর্যাদা শেখায়না। যারা এই অপকর্মের সাথে জড়িত তারা ৯৯% শিক্ষিত নয়কি? তখনি ইতিহাসের পাতায় চলেযায় দৃষ্টি. . .

লর্ড ম্যকলে একজন উদারনৈতিক চিন্তাবিদ ও অত্যন্ত উচুঁস্তরের বুদ্ধিজীবী। ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ পর্যন্ত ছিলেন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলের আইন সংক্রান্ত সদস্য। তাছাড়া ১৮৩৫ সালে ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের দাযিত্বে ছিলেন। সময়টা ১৮৩৫ সালের ২ রা ফেব্রুয়ারী, শিক্ষা সংক্রান্ত আলোচনায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রচন্ড বিতর্কের মধ্যে তিনি তুলে ধরেন তার শানিত যুক্তি . .

“আমি ভারত উপমহাদেশের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বরাবর এক মাথা থেকে অপর মাথা পর্যন্ত ভ্রমণ করেছি এবং আমি সেখানে একটি চোর অথবা একটি ভিখারীও দেখিনি। কিযে সম্পদশালী সেই দেশ! সেখানকার মানুষ এত উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন, কিযে তাদের ধীশক্তি! আমি মনে করি যে এই সকল কারণে ঐ দেশ আমরা কোনদিনও জয় করতে পারব না। এটা সম্ভব হবে কেবল তখনই, যদি আমরা তাদের মেরুদন্ড ভেঙে দিতে পারি। তাদের মেরুদন্ড হলো তাদের সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এইজন্য আমি এই প্রস্তাব রাখছি যে, আমাদের করণীয় হবে, তাদের প্রাচীন ও ঐতিহ্যময় শিক্ষাপদ্ধতি ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে ফেলা। এটা এমনভাবে করতে হবে যেন ভারত উপমহাদেশবাসীরা মনে করে যে, যা কিছু পরদেশী ও ইংরেজী তা সবই ভালো এবং তাদেরগুলোর চাইতে উন্নততর। এভাবে তারা তাদের আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলবে, আরও হারিয়ে ফেলবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। আর এভাবে তারা গড়ে উঠবে ঠিক তেমনটি করেই, যেমনটি আমরা চাই – একটি সত্যিকারের বশীভুত পরাধীন জাতি.

(“I have traveled across the length and breadth of India and I have not seen one person who is a beggar, who is a thief. Such wealth I have seen in this country, such high moral values, people of such calibre, that I do not think we would ever conquer this country, unless we break the very backbone of this nation, which is her spiritual and cultural heritage, and, therefore, I propose that we replace her old and ancient education system, her culture, for if the Indians think that all that is foreign and English is good and greater than their own, they will lose their self-esteem, their native self-culture and they will become what we want them, a truly dominated nation.” – Lord Macaulay)

সে স্ট্রাটেজীকে সামনে রেখে ময়দানে নামে উইলিয়াম কেরীর ন্যায় বহু পাদ্রী। প্রতিষ্টিত হয় শ্রীরাম পুর কলেজ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, হিন্দু কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। গড়ে তোলা হয় ছাপা খানা। প্রকাশনা শুরু হয় বহু পত্র-পত্রিকার। লক্ষ্য, বাংলার হিন্দুদেরকে তাদের প্রতিবেশী মুসলমানদের থেকে আলাদা করে মন ও মননে, চেতনা ও দর্শনে ভিন্ন তাদের কাছের মানুষ রূপে গড়ে তোলা

লর্ড ম্যাকলে ভারত উপমহাদেশের আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির ক্ষমতা শনাক্ত করতে পেরেছিলো। বৃটিশ সরকার ম্যাকলের প্রস্তাবকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেছিলো। এবং সেই অনুসারে পলিসিও তৈরী করে। ১৮৩৫ থেকে ১৯৪৭ এই সুদীর্ঘ ১১২ বছর ছিলো মূলতঃ ঐ পলিসিরই বাস্তবায়নের যুগ। যার ফলে আমাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া ইংরেজী ভাষার ব্যাপক প্রভাবে আমরা আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য, আদর্শ-আধ্যাত্মিকতা, এক কথায় স্বকীয়তা হারিয়েছি। পাশাপাশি হারিয়েছি নৈতিক মূল্যবোধ ও ধীশক্তি! পরাধীনতার শৃংখলটাকেই আমাদের ভাগ্য বলে মনে নিয়েছি। নৈতিক মূল্যবোধ ও মনোবলের অভাবে আমরা মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াবার শক্তি অর্জন করতে পারিনি বহুকাল। সেই সুযোগে চলেছে আমাদের দেশে প্রচলিত পুরাতন শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য, আদর্শ-আধ্যাত্মিকতা, ইত্যাদির ধ্বংসযজ্ঞ। যাতে আমরা সচেতন হয়ে উঠলেও খুব সহজে তাকে আর ফিরে পেতে না পারি।

আবারো মাথায় আসলো ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কলোনিজ সেক্রেটারী মি.জর্জ গাডস্টোনের কথা। দীর্ঘ গবেষনার পরে তিনি বলেছিলেন,

”যতদিন মুসলিমদের হাতে আল-কোরআন থাকবে,আমরা তাদেরকে বস করতে পারবো না। হয় আমাদেরকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে অথবা তারা যেন এর প্রতি ভালবাসা হারিয়ে ফেলে তার সকল ব্যবস্থা করতে হবে।”

(“So long as the Muslims have the Quran, we shall be unable to dominate them. We must either take it from them or make them lose their love of it.”)

শুরু হলে নতুন আরেক ধরনের চক্রান্ত। যুগযুগ ধরে মুসলিম সমাজে চলে আসা অনেক কালচারকে তুলে দেওয়া হল অত্যন্ত সুকৌশলে। আরবি ভাষাকে ক্রমান্নয়ে ডিটাচ করা হল আমাদের থেকে। ধর্ম থেকে শিক্ষাকে আলাদা করে তৈরী করা হলে সেকুলার জাতি। দিনে দিনে আমরা হলাম পালছাড়া গরুর পাল। ভুলে গেলাম আমাদের ঐতিহ্য। আমারা কি ভুলিনি আমাদের স্বকীয়তা ? ইসলামী কালচার, ইসলামী সংস্কৃতি পালন-লালন করতে আজ আমাদের ভয় হয়না? নাটক-সিনেমাগুলোতে আজ ইসলামকে,ইসলামী পোশাককে হেয় করা হয়না?

আমাদের নিজেদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য, আদর্শ-আধ্যাত্মিকতা সব কিছুই বিলুপ্ত হয়ে তার স্থান দখল করে নিয়েছে ভীনদেশী সবকিছু। ফলে আমাদের কাছে পরের দেশ হয়েছে স্পষ্ট, আর নিজের দেশ হয়েছে অস্পষ্ট। আমাদের পূর্বপুরুষদের ঘাম আর রক্তের বিনিময়ে ঔপনিবেশিক অভিশাপ থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি সত্য, কিন্তু পরিপূর্ণ মুক্তি আমাদের আসেনি। লর্ড ম্যকলে-এর ধারাবাহিকতা এখনো বজায় রয়েছে।

এই সবকিছু নীরব অবলোকন করে যাওয়াই কি আমাদের ভাগ্য? আমরা শিক্ষা গ্রহন করছি কেন? টাকা উপার্যন করাই কি আমাদের একমাত্র কাজ? আমরা কি কখনো ঘুরে দাঁড়াবো না?

অশ্রুশিক্ত কোন বোন নয়। শিক্ষার নামে কোন কুলাঙ্গার তৈরী নয়। ইসলাম মানে জঙ্গি নয়। জাতি তৈরী হোক সত্য ও ‍সুন্দরের জয়গান গেয়ে। ইনশাল্লাহ সত্য ইতিহাস জানার মাধ্যমেই বোধদয় ঘটবে আমাদের। মেকলে আর গাডস্টোনের চেয়ে শতগুন ধী-শক্তি সম্পন্ন বীর জন্ম হবে প্রিয় বাংলাদেশে।

হে ভাগ্য বিধাতা!আমাদের মাঝেই তৈরী কর বদিউজ্জামান সাইদ ‍নুসরীর মত দায়ী। যিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলবেন,

“I Shall proved and demonstrated to the world that the Quran is an undying and in extinguishable sun.(আামি অবশ্যই প্রমান করবো এবং দুনিয়াকে দেখাবো যে, আল কোরআন মৃত্যুহীন এবং নিভিয়ে ফেলা যায় না এমন এক সূর্য।”

 

মাহমুদ হাসান

লেকক ও সাংবাদিক

ব্যাক্তিগত ওয়েব সাইট:  www.swapnerghuri.com

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes