বুধবার , ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
শিরোনাম

সড়ক হবে যানজটমুক্ত

রাস্তার মোড়গুলোতে এক মুহূর্তের জন্য থামবে না গাড়ি, থাকবে না যানজট। রাজধানী ঢাকার সড়কেও তা সম্ভব_ কাগজে-কলমে এটা প্রমাণ করে দিয়েছেন প্রকৌশলী কামরুল হাসান। কামরুল হাসানের দাবি, তার উদ্ভাবিত ‘কামরুলের এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে রাস্তায় যানজট বলে কিছু থাকবে না। বরং বর্তমানে যে স্থান যত বেশি যানজটে আক্রান্ত, সে স্থান তত বেশি ফাঁকা হয়ে যাবে। বিশেষ করে এখন রাস্তার মোড়গুলোতে যানজটের তীব্রতা প্রকট, ‘সুপার এল ইয়ার্ড’ প্রয়োগ করলে এই মোড়গুলোতে অনেকটা শূন্যতা বিরাজ করবে।

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক জার্নালেও ‘কামরুলের এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতি সম্পর্কে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নেতৃত্বে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সান্টেফিক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ (্আইজেএসইআর) কামরুল হাসানের উদ্ভাবিত তত্ত্বকে গ্রহণ করেছে। সেপ্টেম্বর-২০১৬ সংখ্যায় যানজট নিরসনে কামরুলের গবেষণাটি প্রকাশ করেছে। শিরোনাম ছিল_ ‘কামরুল’স এল ইয়ার্ড সিস্টেম : এ কুইক সলিউশন অব ট্রাফিক কনজেশন’। এর আগে ‘কামরুল মডেল’ নামে আরেকটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন কামরুল হাসান। সেটিও বিনা সিগন্যালে গাড়ি চলাচলের পদ্ধতি। ২০১৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সমকালে প্রকাশিত হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নজরে আসে কামরুল হাসানের উদ্ভাবিত পদ্ধতি। পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বর্তন কর্মকর্তাদের একাধিক বৈঠকের পর পদ্ধতিটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সব বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি বৈঠকে ‘কামরুলের মডেল’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তা পরীক্ষা করে দেখারও সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

গত বছরের অক্টোবরের শুরুতে সিদ্ধান্ত হয়, ওই মাসের ১২ তারিখের মধ্যে ‘কামরুল মডেল’ এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। আগেই সিদ্ধান্ত ছিল, পরীক্ষা সফল হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় প্রয়োগ করা হবে তা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বছর ঘুরলেও সেই পরীক্ষা আজও করেনি সিটি করপোরেশন।

বহু বছর ধরেই ঢাকার প্রধান সমস্যা যানজট। ঘর থেকে বের হয়েই লড়তে হয় যানজটের সঙ্গে। গবেষকরা বলছেন, বছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয় যানজটের কারণে। বছরে অপচয় হয় প্রায় ৮ হাজার কোটি কর্মঘণ্টা। সর্বগ্রাসী যানজট নিরসনে সরকারের উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাব নেই। শতাধিক প্রকল্প পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সংশোধিত কৌলশগত পরিববহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, যানজট নিরসনে আগামী ২০ বছরে ঢাকায় ব্যয় করতে হবে দুই লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এ টাকায় ১০টি পদ্মা সেতু করা যায়।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী কামরুল হাসানের দাবি, এত কিছুর প্রয়োজন নেই। তার উদ্ভাবিত ‘কামরুলের এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতি প্রয়োগ করেই রাস্তার মোড়ে (ইন্টারসেকশন) প্রতি মুহূর্ত যান চলাচল চালু রাখা সম্ভব। সিগন্যাল বলে কিছুই থাকবে না।

কামরুল হাসান জানান, মোড়গুলোতে যুক্ত সড়কগুলোতে বিপরীত দিকে ঘোরার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। যা দেখতে ইংরেজি অক্ষর ‘এল’ এর মতো। রাস্তার মিডিয়ানগুলো (সড়ক বিভাজক) সংস্কার করেই এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব।

কীভাবে এ পদ্ধতি কাজ করবে? এ প্রশ্নে কামরুল হাসান উদাহরণ হিসেবে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরকে বাছাই করেন। ১০ নম্বর গোল চত্বরে চারটি রাস্তা মিলিত হয়েছে। ফলে একটি রাস্তা খোলা থাকলে ট্রাফিক পুলিশকে বাকি তিনটি রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। একটি রাস্তা পাঁচ মিনিট করে বন্ধ করা হলেও ১৫ মিনিট পর যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় অন্য রাস্তার যাত্রীদের। এ সময়ে দীর্ঘ যানজটও লেগে যায়। ‘কামরুলের এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতিতে কোনো রাস্তাই বন্ধ রাখতে হবে না। সব রাস্তা দিয়ে সারাক্ষণ গাড়ি চলতে পারবে।

বাংলাদেশে ‘বাঁ হাতি’ পদ্ধতিতে গাড়ি চলাচল করে। অর্থাৎ, গাড়িগুলো ডান দিকে মোড় নিতে চাইলে কিংবা সোজা যেতে চাইলে সিগন্যালে আটকা পড়তে হয়। বাঁয়ে মোড় নেওয়ার ক্ষেত্রে এ অসুবিধা নেই। তবে ‘কামরুলের এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতিতে ডান দিকে মোড় নেওয়া এবং সোজা যাওয়ার পথে গাড়ি থামাতে হবে না।

এল ইয়ার্ড পদ্ধতিতে বর্তমান সময়ের মতোই গাড়ি বিনা বাধায় বাঁ দিকে মোড় নিতে পারবে। ধরা যাক, একটি গাড়ি মিরপুরের রোকেয়া সরণি থেকে মিরপুর-১৪ নম্বরের দিকে যাচ্ছে। ‘কামরুলের এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতিতে গাড়িটি সোজাসুজি পল্লবীর দিকে যাবে। সেখানে স্থাপিত ‘এল ইয়ার্ডে’র মধ্য দিয়ে ঘুরে গাড়িটি মিরপুর-১৪ নম্বরের দিকে চলে যাবে। এতে ১০০ মিটার দূরত্বে যেতে ৩০০ মিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু গাড়ি কোথাও থামাতে হবে না। সর্বোচ্চ এক মিনিট সময় লাগবে। কিন্তু আগের মতো সিগন্যালে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হবে না। যানজটও সৃষ্টি হবে না। এল ইয়ার্ডের মধ্য দিয়ে একই সময়ে আসা সব গাড়ি ঘুরতে পারবে। তাই এল ইয়ার্ডের মধ্যে কোনো গাড়ি বিকল হলেও তা সচল থাকবে।

ইউপুলের জন্য রাস্তা ৩০০ ফুট প্রশস্ত করা প্রয়োজন। ‘এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতি এত প্রশস্ত রাস্তার প্রয়োজন নেই। ছোট গাড়ির ৮৫ ফুট এবং বড় গাড়ির জন্য ১২৫ ফুট প্রশস্ত সড়ক প্রয়োজন। ঢাকার মূল সড়কগুলো ১০০ ফুটের বেশি প্রশস্ত। তাই রাস্তা প্রশস্তকরণের প্রয়োজন হবে না ‘কামরুলের এল ইয়ার্ড’ বাস্তবায়নে। তবে পুরান ঢাকার মতো যেখানে রাস্তা সরু, সেখানে রাস্তা ৮৫ ফুট প্রশস্ত করতে হবে।

‘এল ইয়ার্ড’ তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। এগুলো হলো_ ‘সিম্পল এল ইয়ার্ড’, ‘মডারেট এল ইয়ার্ড’ এবং ‘সুপার এল ইয়ার্ড’। কামরুল হাসান জানান, মডারেট এল ইয়ার্ড প্রয়োগ করলেই ঢাকার রাস্তায় আর যানজট থাকবে না। সুপার এল ইয়ার্ডের যানজট নিরসন ক্ষমতা মডারেট এল ইয়ার্ডের চেয়েও বেশি। এ পদ্ধতি প্রয়োগে রাস্তায় যানবাহনের চাপই থাকবে না। বর্তমানে রাস্তার যেসব অংশ বিশেষত মোড় যানজটে অচল থাকে, সেসব অংশ একেবারেই ফাঁকা হয়ে যাবে বলে জানান কামরুল হাসান।

কামরুল হাসান জানান, একটি মোড়ে ‘এল ইয়ার্ড’ পদ্ধতি বাস্তবায়নে তিন দিন সময়ই যথেষ্ট। যেখানে ফ্লাইওভার নির্মাণে সময় লাগে বছরের পর বছর। আর ‘এল ইয়ার্ড’ নির্মাণ ব্যয় ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পের তুলনায় নগণ্য। হাজার ভাগের এক ভাগও নয়।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes