সোমবার , ২৮ মে ২০১৮
শিরোনাম

তারেক রহমান আসলে কতটা অর্বাচীন: গোলাম মওলা রনি

RonY_MPগোলাম মওলা রনি

২০১৪ সালে তার বয়স ৪৯ বছর পার হতে চলল। তার রাজনীতির বয়সও কম নয় প্রায় ২৮ বছর। ১৯৮৮ সালে তিনি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। এর পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির বহু রকম জটিল ও কুটিল পথের হাজারো বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে তার দল এ যাবৎকালে তিন-তিনবার ক্ষমতার আসনে বসেছে। একবার পরাজিত হয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে। অন্যবার নিজেদের পাতা জালে আটকা পড়ে পরাজিত হয়েছে এবং পরাজয়ের আগে ক্ষমতা থেকে রীতিমতো উচ্ছেদ হয়েছে রাষ্ট্রশক্তি এবং জনশক্তির সম্মিলিত চাপে। ক্ষমতার এই পালাবদলের ঝক্কিঝামেলা তারেক জিয়ার ২৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনকে বারবার সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে এমনতরো সঙ্কট যা কিনা একজন বালককেও বৃদ্ধ বানিয়ে ফেলে!

আমি আসলে কয়েক দিন ধরেই তারেক জিয়াকে নিয়ে ভাবছিলাম। বিশেষত তার বিরুদ্ধপক্ষ প্রায়ই তাকে যে অর্বাচীন বলে গালি দেয়, সেই অর্বাচীন শব্দটি নিয়ে ভাবছিলাম। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে আসুন অর্বাচীন শব্দটির মানে জেনে নিই। এটি একটি বহুমুখী শব্দ। ইংরেজিতে এর প্রতিশব্দ হলো Posterior, Younger, New, Modern, Unwise, Foolish, Too Immature. অন্য দিকে বাংলায় প্রতিশব্দ লেখা হয়েছে নবীন, আধুনিক, অপ্রবীণ, অপরিপক্ব বুদ্ধি, মূর্খ, পশ্চাৎবর্তী। বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষার ব্যাকরণ মতে এটি বিশেষণ, অর্থাৎ গুণবাচক বা দোষবাচক শব্দ।

আগেই বলেছি শব্দটি বহুমুখী। অর্থাৎ এটি মন্দ কাজে যেমন ব্যবহার করা যায়, তেমনি ভালো কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে। আমার বিশ্বাস তারেকবিরোধীরা তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ, ঘৃণা, ক্রোধ, উত্তেজনা এবং ঠোঁট-জিহ্বা-মনের জ্বালা মেটানোর জন্য অর্বাচীন শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলা ভাষায় হাজারো জ্বালাময়ী শব্দ থাকতে তারা কেন একটি দ্বিমুখী শব্দ ব্যবহার করছেন? তারা কি এটা জেনে শুনেই করছেন? নাকি অর্থটর্থ না বুঝেই করছেন তা আমি বলতে পারব না। মানুষ সম্পর্কে আমি সব সময় পজেটিভ ধারণা করি। সে অর্থে ধরে নিলাম সব তারেকবিরোধী হলেন প্রচণ্ড জ্ঞানী। আরবিতে বলা যেতে পারে হেকমতওয়ালা বা হেকমতওয়ালী। তারা তারেক রহমানের প্রশংসার জন্য নয় বরং তার সর্বনাশের জন্যই তাকে অর্বাচীন বলছেন।

এবার আমি অর্বাচীন শব্দের মন্দ প্রতিশব্দগুলো ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করলেই সম্মানিত পাঠককুল সহজে বুঝতে পারবেন তারেক জিয়া আসলে কতটা অর্বাচীন। এই শব্দের মন্দ অর্থের নায়ককে হতে হবে অল্প বয়সী। ইংরেজিতে বলা হয় Too Immature. একে কোনো মতেই বালক বলা যাবে না। আবার নাবালকও বলা যাবে না। তা হলে কী বলব? শিশু! কিংবা সদ্যজাত শিশু! যদি বালক-নাবালক-শিশু কিংবা সদ্যোজাত শিশু বলি তবে তারেক জিয়া তো ফেরেশতাদের চেয়েও উত্তম হয়ে যাবেন। কারণ শিশু থেকে বালক বেলা পর্যন্ত মানুষ থাকে মাসুম। তারা কোনো গুনাহ করে না, করতে পারে না। তাদের কোনো মতেই মনুষ্য সমাজ বা আল্লাহর দরবার তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে না। তারা থাকে সমাজ সংসারের আদরের ধন, চোখের মণি এবং কারো কারো কলিজার টুকরো। নিরপরাধ ও বেগুনাহগার এসব অর্বাচীন দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর কাছে ফেরেশতাদের তুলনায় বেশি মর্যাদাবান বিবেচিত হন। তারেকের বিরুদ্ধবাদীরা নিশ্চয়ই অর্বাচীন শব্দ দ্বারা বাংলা শব্দভাণ্ডারের বালক বা তার চেয়েও অধস্তন কোনো মনুষ্য শ্রেণীকে বোঝাতে চাইবেন না!

আমার কথা সোনার পর কেউ কেউ বলতে পারেন, আচ্ছা! আমরা এবার বালক থেকে না হয় একটু ওপরে উঠি। তাকে আমরা চঞ্চল কিশোর বা দুষ্টু কিশোর বলে গালি দেবো। এ ক্ষেত্রে বাংলা ব্যাকরণ হয়তো আপনার বিপক্ষে চলে যাবে বলবে বালকের ওপরে উঠল, আপনি আর অর্বাচীন শব্দটি ব্যবহার করতে পারবেন না। আপনি হয়তো ‘রেগেমেগে’ অস্থির হয়ে বলবেন আরে রাখেন আপনার ব্যাকরণ। আমরা তাকে অর্বাচীন বলেছি তার মূর্খতার জন্য; বয়সের জন্য নয়। ব্যাকরণ আবার বেঁকে বসবে। বলবে, মূর্খ অর্থ বোকা, বুদ্ধিহীন, নির্বোধ, অশিক্ষিত, অনভিজ্ঞ, অজ্ঞ। তারেক জিয়ার লোকজন হয়তো অভিমান করে বলতে পারেন আরে মিয়া! তুমি দুই টাকার বটতলার উকিল! কোনো মতে টেনেটুনে বিএ পাস করতে তোমার এগারো বালতি পানি খেতে হয়েছে, মক্কেলের চিন্তায় তোমার মাথায় একটি চুলও নেই, আর তুমি কিনা বলছ আমাদের নেতা মূর্খ! যত্ত সব অসভ্য কোথাকার!

আপনি তারেক জিয়ার লোকজনকে এড়িয়ে হয়তো পুনরায় ব্যাকরণের কাছে ফিরে যেতে চাইবেন। কারণ ব্যাকরণ আপনাকে গালাগাল না করে সঠিক কথাটাই বলবে। ব্যাকরণ মতে, রাজনীতির জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সনদের দরকার নেই। এগুলো থাকলে ভালো হয়। কিন্তু না থাকলে ক্ষতি নেই। তাবৎ দুনিয়ার বেশির ভাগ মহান শাসক, রাজ্য-বিজেতা এবং দার্শনিক ছিলেন নিরক্ষর। তাদের প্রধান যোগ্যতা ছিল মানুষের চাহিদা, রুচি, মন ও মননশীলতা বোঝা এবং মানার এক অসাধারণ দক্ষতা। ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা:, সম্রাট আকবর, সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজী, চেঙ্গিস খান প্রমুখ ছিলেন একেবারেই উম্মি বা নিরক্ষর। তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা, শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাজনীতিতে তাদের অমরত্ব পৃথিবীর শিক্ষিতজনেরা আজো অতিক্রম করতে পারেননি। ফলে দেশ-বিদেশের ডিগ্রিওয়ালা এক-দু’জনকে সামনে এনে যদি বলেন, তারেক এদের তুলনায় অল্প শিক্ষিত, তাহলে তা রাজনীতির ময়দানে ধোপে টিকবে না। এখানে হয়তো আপনি আবার প্রশ্ন করতে পারেন আচ্ছা, ধোপে শব্দের অর্থ কী বা রাজনীতির ময়দানের ধোপে বলতে কী বোঝায়? ব্যাকরণ বলবে ধোপা যেভাবে কাপড় পরিষ্কার করার জন্য উল্টেপাল্টে কাপড় পেটাতে বা আছড়াতে থাকে, তেমনি রাজনীতির ময়দানে প্রতিপক্ষের এবং আপনপক্ষের লোকেরা একজন রাজনীতিবিদকে উল্টেপাল্টে ধোলাই করতে থাকে। তাই রাজনীতির ময়দানের খেলোয়াড় হতে হলে থাকতে হবে সহজাত রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপম গুণাবলি। আর এসব গুণা ছাড়া কেউ যদি কয়েকটি দেশী-বিদেশী উং-ফং-ফং মার্মা ডিগ্রি-ফিগ্রি নিয়ে খেলতে নামে, তবে রাজনীতির ধোপে সে টিকবে না। ধোপার আছাড় খেয়ে দুর্বল কাপড় যেভাবে ফেটে যায় এবং রঙ উঠে যায় তেমনি লোকটিও ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, তার ডিগ্রি-মিগ্রি যে কোথায় যাবে, লোকজন একবারো খুঁজে দেখবে না।

আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন তারেকের কী এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব গুণ রয়েছে যা রাজনীতির ধোপে টিকে আছে! তারেকভক্তরা বলবেন, অবশ্যই আছে। তার যোগ্যতা না থাকলে তিনি আজ অবধি টিকতে পারতেন না। তার রাজনীতির হাতেখড়ি ১৯৮৮ সালে যখন বিএনপি নামের দলটি ইতিহাসের অন্যতম শোচনীয় দুর্দশার মধ্যে ছিল। তখনকার বিএনপি এবং জিয়া পরিবারের আর্থিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক দৈনদশা ২০১৪ সালের চেয়ে অনেক গুণ করুণ ছিল। সেই থেকে আজ অবধি তিনি তার আপন যোগ্যতায় দলের ভেতর ও বাইরে এবং দেশ ও বিদেশে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয়, সমর্থক শ্রেণী, কর্মিবাহিনী ও উপদেষ্টামণ্ডলী গড়ে তুলেছেন। তিনি তার দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার দলের প্রধান ব্যক্তি যদি তার মা না হতেন এবং তাকে তার বর্তমান অবস্থান থেকে পদচ্যুত করতে চাইতেন তবে হয়তো পারতেন না। ফলে তারেকের রাজনৈতিক গুণাবলির কারণেই বাংলাদেশের একটি বৃহত্তম দলে অন্তত দুইজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি আছেন, যারা ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক একে অপরের পরিপূরক বা সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য। অন্য দিকে তার প্রতিপক্ষের দলগুলোতে সব কিছুই এককেন্দ্রিক। ওসব দলে তারেকের সমকক্ষ প্রতিপক্ষ একজনও নেই।

তারেককে আপনি বোকা বা নির্বোধও বলতে পারবেন না। বললে আপনি নিজের কাছে নিজেই অপমানিত হয়ে পড়বেন। আপনি যদি তারেককে দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতালোভী ইত্যাদি বলতে চান তাহলে তাকে বোকা বলতে পারবেন না। কারণ, বোকারা ওসব জানে না। আপনি হয়তো এবার মূর্খের অন্য সব প্রতিশব্দের মধ্যে বিলীন হওয়ার চেষ্টা করবেন। বলবেন, ও একটা বুদ্ধিহীন এবং অনভিজ্ঞ। আপনার কথা শুনে তারেকভক্তরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়বে। তারা বলবে, একজন বুদ্ধিহীন অনভিজ্ঞের কূটকৌশলে কেন আপনার সারা শরীরে জ্বালা ধরে যায়? কেন আপনি বারবার উত্তেজিত হয়ে তাকে লন্ডন থেকে ধরে নিয়ে আসার হুমকি দেন? আপনি কেন তাকে পাগল বলে গালি দিয়ে তার বত্রিশটি দাঁত ফেলে দিতে চান? তারেকভক্তরা তাদের বত্রিশটি দাঁত বের করে যদি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে ‘আচ্ছা কাগু! আপনি কি রাস্তার কোনো ন্যাংটা পাগলকে বকর বকর করতে দেখেছেন? আপনি সরল বিশ্বাসে বলবেন হ্যাঁ, দেখেছি! তারা পাল্টা প্রশ্ন করে যদি জিজ্ঞেস করে প্রলাপরত পাগলের কথা শুনে আপনি কি কোনো দিন পাগলটির সামনে গিয়ে প্রবল উত্তেজিত হয়ে বলেছেন ‘এই হুয়ার পো, পাগলের বাচ্চা! চাইয়্যা দ্যাখ আমার নাম ওমুক! আমার ডিগ্রির নাম তমুক। আমার পদের নাম ওমুক! লোকজন আমাকে বহুৎ মান-ইজ্জত করে, ভয় পায়। তুই পাগলামি বন্ধ কর, নইলে চড়াইয়্যা তোর জামির বত্রিশটা দাঁত ফালাইয়া দিমু।’ তারেকের লোকজনের কথা শুনে আপনি হয়তো আবার উত্তেজিত হয়ে যাবেন এবং বলবেন সোনামণিরা! তোমরা মোরে পাগল পাইছো যে মুই পাগলের সামনে যামু চোপড়াচুপড়ি করতে?

আপনার মেজাজ ঠাণ্ডা করার জন্য তারেকভক্তরা এবার অ্যাকাডেমিক আলোচনায় চলে যাবে। তারা তাদের নেতার বাস্তব অভিজ্ঞতার ফিরিস্তি বর্ণনা করবে। তারা বলবে, তারেক ছিলেন এ দেশের হাতেগোনা অল্প কয়েকজন হতভাগ্য বালকের অন্যতম, যে কিনা মহান মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছিলেন। পাকবাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন এবং ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর এস আবদুল্লাহ নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দখলদার বাহিনী সেখান থেকেই তাদের গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। ১৬৭ দিন পর ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর তাদের উদ্ধার করা হয়। এরপর স্বাধীন দেশে তার পিতা প্রথমে হন উপ-সেনাপ্রধান। পরে সেনাপ্রধান এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। সবশেষে রাষ্ট্রপতি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর পুরো পরিবার যে নির্মম অভিজ্ঞতার শিকার হয়, তা তারেককে জীবনের একটি নতুন অধ্যায় সম্পর্কে জ্ঞান দান করে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের ৮-৯ বছর, রাষ্ট্রক্ষমতার দুই মেয়াদের ১০ বছর এবং ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার পর কারাবাস এবং প্রবাসের আটটি বছর তাকে কি কোনো অভিজ্ঞতাই প্রদান করেনি? অবশ্যই করেছে এবং এই অভিজ্ঞতা এতটাই বাস্তব ও এতটাই নির্মোহ এবং শিক্ষণীয় যে, দেহের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা পর্যন্ত অভিজ্ঞতার জ্ঞান ভুলে থাকা সম্ভব নয়। রাজনীতির এই বাস্তব অভিজ্ঞতা এক শ’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার বছর ধরে রাজনীতির শাস্ত্রগুলো অধ্যয়ন করেও অর্জন সম্ভব নয়।

এবার বোধ হয় আপনি অর্বাচীন শব্দটির প্রয়োগ নিয়ে আরো একটু সতর্ক হতে চাইবেন এবং তারেক জিয়াকে ঘায়েল করার জন্য বাংলা ও ইংরেজি ভাষার অন্যসব চমৎকার বাজে শব্দগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। আপনি আপনার কাজ নিয়ে চিন্তা করতে থাকুন এবং সময় ও সুযোগ হলে তারেক সম্পর্কে আমার মূল্যায়নগুলো বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করুন। আমার মতে তারেক অর্বাচীন নন, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা-কূটকৌশল এবং প্রথার উদ্ভাবক। সাম্প্রতিক কালে লন্ডনে বসে তিনি যেসব কথাবার্তা বলেছেন, সেসব কথার দায় থেকে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন বের হতে পারেনি। তিনি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পূর্ববর্তী রক্তঝরা দিনগুলো নিয়ে যেসব অভিযোগ ও আপত্তি উত্থাপন করেছেন, পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এ কে খন্দকার বই লিখে সেসব অভিযোগের ভিত্তিকে সত্যায়িত করেছেন। শুধু কি তাই! মহান মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি শহীদ বঙ্গতাজের কন্যা শারমিন আহমদ তার ‘তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে প্রায় একই কথা বলেছেন। কাজেই তারেক জিয়ার বক্তব্য এবং তৎপরবর্তী সময়ে দু’টি বিস্ময়কর বইয়ের বোমা ফাটানো তথ্যগুলোকে আমি একসূত্রে গ্রথিত না করে নিয়তির খেলা বলে অর্বাচীনের মতো ভাবতে পারছি না।

তারেক জিয়া তার ২৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ইদানীংকালের মতো কথাবার্তা বলেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যাকে প্রধানমন্ত্রী না বলে শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বলছেন। শুধু তাই নয় অত্যন্ত ঠাণ্ডা মেজাজে, গম্ভীর গলায় বঙ্গবন্ধুকন্যাকে তুমি বলে সম্বোধন করেছেন। এর পর থেকে তার দলের অনুসারীরা তাকে অনুকরণ করে সারা বাংলাদেশে একই ভাষায়, একই শব্দে আওয়ামী লীগের মর্যাদার জায়গায় বারবার আঘাত করছে। আওয়ামী লীগ প্রথম প্রথম বিষয়টিতে রা করেনি। কিন্তু ইদানীংকালে মনে হচ্ছে তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। কয়েক দিন আগে দেখলাম আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা তারেক জিয়া এবং অন্য বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ করে বলছেন প্রধানমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী না বলে হাসিনা বলে তুই-তুকারি করো! তোমাদের এত্ত বড় সাহস! চড়াইয়্যা দাঁত খুলে ফেলব। বেয়াদব কোথাকার! আমার মনে হয়, তারেক জিয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের উত্তেজিত করার জন্যই কথাগুলো পূর্বপরিকল্পনামাফিকই বলেছেন, যা নিতান্ত সাদা চোখে দেখলেও কোনো অর্বাচীনের কাজ বলে মনে হয় না।

আমার আশঙ্কা, আগামী দিনে তারেক জিয়া হয়তো আরো অভিনব কিছু কথাবার্তা বলবেন, যাতে শাসকদলের মধ্যে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। বিএনপির একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক বলছিলেন যে, তারা আগামীতে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সম্বোধন করতে গিয়ে ৫ জানুয়ারির মহাবিপ্লবের কিংবদন্তি স্নেহময়ী জননী এবং নতুন ধারার গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলে ডাকবেন। এই কথা বলার সময় তারা মুচকি মুচকি হাসবেন এবং মাঝে মধ্যে খুকখুকিয়ে একটু-আধটু কাশি দেয়ার চেষ্টা করবেন। আমি বোকার মতো প্রশ্ন করলাম এই অদ্ভুত কর্মে আওয়ামী লীগের কী হবে। তিনি বুদ্ধিমানের মতো সরাসরি উত্তর না দিয়ে একটি গল্প বললেন এক গ্রামের এক নাপিত চুরি-চামারি করে অনেক টাকার মালিক হলো। গ্রামের সবাই তাকে চোর ও নাপিত হিসেবেই জানে এবং সে মতে ঘৃণা করে। লোকটি দু-তিনজন লোক ভাড়া করল। তারা চোরা নাপিতকে তালুকদার সাহেব বলে সম্বোধন করত। এই দৃশ্য দেখে গ্রামের লোকজন প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তাদের ঠাট্টা-মশকারা ও ইয়ার্কির মাত্রা বাড়িয়ে দিলো। নাপিত প্রমাদ গুনল। একে তো নাপিত, তার ওপর সার্থক চোর। ফলে লোকটির বুদ্ধি ছিল ১৬+১৬=৩২ চোঙ্গা। সহজিয়া বুদ্ধিতে সে বুঝল তার কর্মস্থলে দুষ্কর্মের ফসলের ওপর বসে চাুষ সাক্ষীদের সামনে চোরা নাপিত থেকে সম্মানিত তালুকদার সাব হওয়া সম্ভব নয়। সে চিন্তা করল, গ্রাম ছেড়ে ভিনদেশে গিয়ে বসতি স্থাপনের। তার ভাড়া করা লোকজনকে নির্দেশ দিলো তাকে আবারো তালুকদার সাব না ডাকার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে তালুকদারের ভাইরাস সারা গ্রামের পোলাপান, পাগল ও দুষ্টলোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা নাপিতকে দেখলেই বলে ওঠে কী গো তালুকদার সাব, পান খাবানি? পরিস্থিতি এমন হলো যে, তালুকদার নাম শোনামাত্র নাপিতের রক্ত মাথায় উঠে যায়। ঘটনার দিন গ্রামের মনা পাগলা নাপিতকে দেখেই বলে উঠল তালুকদার সাব! পাগলের কথা শোনামাত্র নাপিত কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে পাগলকে জড়িয়ে ধরে পাগলের গালে ও ঘাড়ে জোরসে কামড় বসিয়ে দিলো। কামড় খেয়ে মনা পাগলা সুস্থ হয়ে গেল এবং নাপিত পাগল হয়ে গেল।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

– See more at: http://www.newsevent24.com/2014/11/23/opinion/161229?fb_action_ids=10204402987308128&fb_action_types=og.comments#sthash.Z7WLHm4h.dpuf

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes