শুক্রবার , ২৫ মে ২০১৮
শিরোনাম

‘ডাক্তার নয়, যেন জানোয়ার’

hert hospital৭১বাংলা: নাম এমজি গোলাম আযম। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কার্ডিওলোজি ও সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে আছেন তিনি। কিন্তু, পরিচিত জনদের অনেকেই, এমনকি সহকর্মীদেরও কেউ কেউ তাকে ডাক্তার নয়, জানোয়ার বলেই আখ্যায়িত করে থাকেন। আচার-আচরণ, বেপরোয়া, অর্থলিপ্সাসহ নানা অপকর্মের কারণেই তাকে এমন ঘৃণ্য দৃষ্টিতে দেখা হয়ে থাকে।

সহকর্মী ও পরিচিতজনদের মতে সহকারী অধ্যাপক জিএম গোলাম আযম পেশাগত ও প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে প্রায়ই এমন ঘৃণ্য অর্থাৎ জানোয়ারের মতো আচরণের স্বাক্ষর রেখে থাকেন। সেরকমেরই আচরণ করেছেন তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী মো. সাব্বির মিয়া এবং তার শশুড়ের সঙ্গে। সাব্বির মিয়া ইতিমধ্যে জিএম গোলাম আযমের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। শিগগিরই তিনি লিখিতভাবে অভিযোগ করবেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তিনি জানান, শ্বশুরকে উন্নত চিকিৎসা করাতে গিয়ে হৃদরোগ হাসপাতালের প্রতিটি পদে পদে তাকে হয়রানি এবং পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থও গুণতে হয়েছে। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী, এ পরিচয় দেওয়ার পরও। তবে সবচে’ ন্যক্কারজনক কাণ্ড ঘটিয়েছেন সহকারী অধ্যাপক গোলাম আযম। এই ডাক্তারের আচরণকে তিনি পশুর চেয়েও জঘন্য বলে আখ্যায়িত করেন।

জানা গেছে, সাব্বির মিয়ার শ্বশুর মো. আবুল বাশার স্ট্রোক করলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে তিনি তার শ্বশুরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ৩১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় তারা হৃদরোগ হাসপাতালে আসেন। মো. আবুল বাসারকে জরুরি বিভাগে নিয়ে প্রথমে ইসিজি করা হয়। ইসিজি’র সরকারি ফি জনপ্রতি ৮০ টাকা হলেও তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ১০০ টাকা। এরপর ভর্তি করানো হয়। ভর্তি ফি ১৫ টাকার ক্ষেত্রে তাকে দিতে হয় ৩০ টাকা। ওয়ার্ডে সিট পেতে গিয়ে তাকে অনেক ঝুটঝামেলা এবং পাশাপাশি নগদ অর্থও দিতে হয়েছে।

সাব্বির মিয়া জানান, ওইদিন বিকেলে অন্য একজন রোগী চলে যাওয়ার পর সিট খালি হলে তিনি যখন তার শ্বশুরের জন্য সিটটি ন্যায্য প্রাপ্য হিসেবে নিতে যান, মাস্তান গোছের কয়েকজন লোক তার সামনে এসে দাঁড়ায়। পরে জানতে পারেন, এরা হাসপাতালেরই কর্মচারী। এদের দু’জনের নাম জানতে পারেন- ইউসুফ ও শফিক। মাস্তান গোছের এই কর্মচারীরা তাকে বলেন, সিট পেতে হলে ৫০০ টাকা দিতে হবে। সাব্বির নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও রক্ষা পাননি। সিটের বিনিময়ে অর্থ এদের দিতেই হলো।

ডাক্তারের নির্দেশিত বিভিন্ন টেস্টগুলো করাতে গিয়ে বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর আরো এক তিক্ত পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিলো সাব্বির মিয়াকে। সরকারের নির্ধারিত ৫০০ টাকা তিনি পরিশোধ করেছেন যথানিয়মেই। কিন্তু তিনি পরবর্তীতে দেখতে পান, সরকারি কোষাগারে অর্থ দিতে গিয়ে ভুল করেছেন। কারণ, যারা সরকারি ফি নিয়ম অনুযায়ী জমা দেননি তাদের টেস্ট রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে দুপুর ১২টায়। অন্যদিকে তাকে টেস্ট রিপোর্টের জন্য ২টা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়েছে। এতে তার টাকাও বেশি লেগেছে। তিনি ৫০০ টাকা জমা দিয়েছেন, অন্যদিকে যারা ১২টায় রিপোর্ট পেয়েছে এদের পকেট থেকে গেছে মাত্র ৩০০ টাকা।

সাব্বির মিয়ার শ্বশুর মো. আবুল বাশারকে ভর্তি করা হয় সহকারী অধ্যাপক এমজি গোলাম আযমের অধীনে। আবুল বাশারের এনজিওগ্রাম করার তারিখ নির্ধারিত হয় গত ২ নভেম্বর রোববার। এনজিওগ্রামের জন্য সরকারের নির্ধারিত ফি ২০০০ টাকা। স্বাস্থ্যখাতের কর্মচারী, গরীব, দুঃস্থ্য, মুক্তিযোদ্ধাসহ নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির জন্য এই ফি মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে যে ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসারত ওই ডাক্তারের সুপারিশ লাগবে এতে। সাব্বির মিয়া হাসপাতাল থেকে নির্দিষ্ট ফরম সংগ্রহ করে সহকারী অধ্যাপক গোলাম আযমের কাছে যান। গোলাম আযম ফরমে সুপারিশ লিখতে গিয়ে টালবাহানা করতে থাকেন। সুপারিশ আর লিখে দেননি গোলাম আযম। ফলে সাব্বির মিয়াকে ওই ২০০০ টাকা পরিশোধ করতেই হয়।

২ নভেম্বর এনজিওগ্রামের সিরিয়ালে আবুল বাশারের নাম ৬ নম্বরে পড়ে। অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। গোলাম আযমের এ্যাসিস্ট্যান্ট বেশকিছু ওষুধ ও স্যালাইনের লিস্ট সাব্বির মিয়ার হাতে দেন। বলেন, এনজিওগ্রামের জন্য এগুলো লাগবে। সাব্বির মিয়া সেই অনুযায়ী স্যালাইন ও ওষুধ কিনে আনেন। ৬ নম্বর সিরিয়াল আসলে আবুল বাশারকে স্টাফরা অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে নিয়ে যান।

কিন্তু, সহকারী অধ্যাপক গোলাম আযম রোগী আবুল বাশারকে দেখেই ক্ষেপে উঠেন। তিনি বলেন, একে কেন অপারেশন থিয়েটারে আনা হয়েছে? আমার অন্য বিশেষ রোগী আছে। ওদের এনজিওগ্রাম করতে হবে। স্টাফরা বলেন, স্যার, সিরিয়াল অনুযায়ীই একে ভেতরে আনা হয়েছে। ওটিতে রোগী ঢোকার এই অপরাধে গোলাম আযম বেশি বকাঝকা দেন সাব্বির মিয়াকে। তিনি সাব্বির মিয়াকে বলেন, প্রস্তুতি আছে তো? রিং বসানোর টাকা এনেছেন তো? ৫০ হাজার টাকা লাগবে।

সাব্বির মিয়া বলেন, এনজিওগ্রামের আগে কী করে বুঝবো রিং বসানো লাগবে? এনজিওগ্রামের পর রিং বসানো লাগলে কিছু সময় তো পাওয়া যাবে। তখন টাকা আনবো বাড়ি থেকে।

এ কথার পর গোলাম আযম আরো ক্ষেপে যান। কিছুক্ষণ বকাঝকার পর বলেন, আপনি যে ওষুধ কিনেছেন তাতে এনজিওগ্রাম হবে না। আরো ওষুধ কিনতে হবে। সাব্বির মিয়া বলেন, আপনার এ্যাসিস্ট্যান্ট যে লিস্ট দিয়েছে সেই অনুযায়ী সবগুলোই কিনেছি। কিন্তু, গোলাম আযম একটি দামী ইঞ্জেকশন, যার দাম সাড়ে ৯শ’ টাকা এটিসহ আরো কিছু নতুন করে কেনার জন্য বলেন। সাব্বির মিয়া বলেন, এই ইঞ্জেকশন শুধু একটাই তো লাগার কথা। সেটা কেনা হয়েছে। গোলাম আযম বলেন, দুটো লাগবে। সাব্বির মিয়া বলেন, এনজিওগ্রামের জন্য সবাই তো একটা ইঞ্জেকশনই কিনছে। গোলাম আযম বলেন, আপনার রোগীর জন্য দুটো লাগবে।

সাব্বির মিয়া এই ওষুধগুলো কেনার জন্য দোকানে দৌড় দেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন, তার শশুড়কে ওটি থেকে বের করা হচ্ছে। বলা হলো, এনজিওগ্রাম হয়ে গেছে। মাত্র ১০ মিনিটে এনজিওগ্রাম হয়ে গেলো, অবাক হন সাব্বির মিয়া। স্টাফরা তার হাত থেকে এই ওষুধগুলোও নিয়ে গেছে। তিনি দেখেন, আগে যে ওষুধগুলো আনা হয়েছিলো সেগুলোর কিছুই ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি স্যালাইনও রয়ে গেছে। তার শ্বশুরকে নাকি গোলাম আযম বলে দিয়েছেন, রিং পরাতে হবে। ৫০ হাজার টাকা লাগবে। তা নাহলে আর কোনো চিকিৎসা হবে না।

সাব্বির মিয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন। সেই সুবাদে অন্তত এই সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার-কর্মচারীদের কাছে কিছুটা ভালো আচরণ পাবেন আশা করেছিলেন। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় মুখ করে শ্বশুরকে ঢাকা নিয়ে এসে এখানে ভর্তি করান। কিন্তু, এই পর্যায়ে এসে তিনি মহাফাঁপরে পড়েছেন। উন্নত চিকিৎসা তো দূরের কথা, রোগ নির্ণয়ের কাজটাও হলো না। এরই মাঝে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। এনজিওগ্রামের ফি বাদে ওষুধ বাবদই খরচ হয়ে গেছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। যে ওষুধগুলো ব্যবহার না করে ডাক্তার নিয়ে গেছেন।

ক্ষুব্ধ-হতাশ সাব্বির মিয়া ২ নভেম্বর বিকেলে তার মন্ত্রণালয়ে এসে অন্যদের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ফোন করা হয়। গোলাম আযমের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। গোলাম আযমের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা প্রায় সকলেই তার আচরণ সম্পর্কে অত্যন্ত খারাপ মন্তব্য করেন। কেউ কেউ তাকে ডাক্তার নয়, জানোয়ার বলেই আখ্যায়িত করেন। কিন্তু, তারপরও তাকে কিছুই করা যাচ্ছে না বলে জানান। কারণ, তিনি আওয়ামীপন্থি প্রভাবশালী ডাক্তার।

 

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes