সোমবার , ২৮ মে ২০১৮
শিরোনাম

তাজরীনের ১৪ নিহতের পরিবার পেয়েছেন হয়রানি, পাননি একটি পয়সাও!

tazrin৭১বাংলা : আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডের দুই বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র কিছুদিন বাকি। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে এই গার্মেন্টে। কিন্তু এতগুলো দিন পেরিয়ে গেলেও ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত/নিখোঁজ ১৩ শ্রমিকের পরিবার পরিজন আজও কোনো অর্থসাহায্য পাননি সরকার বা গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র কাছ থেকে। যদিও এই ১৩ পরিবারকে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে অনেক আগেই। শেষ ছয় মাস আগে ‘চেক প্রস্তুত আছে’ বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তরা এক পয়সাও পাননি। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষগুলোকে হারানোর শোক আর অনাহার-অর্ধাহার এখন তাদের নিত্যসঙ্গী।

তাজরীনের নিহত/নিখোঁজ পরিবারবর্গ এবং আহতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, তাদের মধ্যে অনেকেই এখনো প্রিয়জনের লাশের সন্ধানও পাননি। সরকারি হিসাব মতে তোবা গ্রুপের তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা যান ১১১ জন শ্রমিক। তাদের মধ্যে ৯৮ জনের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মাধ্যমে সাত লাখ করে টাকা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাকি ১৩ নিহতের পরিবারের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিত। নানা পদের হয়রানি ব্যতিরেকে এখনো তাদের কপালে কিছু জোটেনি। নিহত/নিখোঁজ এই শ্রমিকরা হচ্ছেন রোজিনা, আকলিমা, মাহফুজা, রেহানা, হেনা, লাভলী, লাইলী, জোনাব আলী, আহেনুর, সালমা, জাহেদা, আসমা ও শাহানা শারমিন। শুধু এই ১৩ পরিবারই যে বঞ্চিত, তা নয়। ইতোমধ্যে ওই অগ্নিকাণ্ডে আহতদের কয়েকজন পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তাদের পরিবারও এখন একই ক্ষতিপূরণের দাবিদার। এমন ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো তালিকা প্রণয়ন বা এদের চিহ্নিত করে সাহায্য করার কোনো প্রতিশ্রুতি বা উদ্যোগ এখনো নেয়নি সরকার।

হয়রানি পদে পদে
হয়রানির শিকার ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়া ১৩ পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। তারা জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ২৫ নভেম্বর, ২০১২ সাদা বডিব্যাগে করে সরকার-মালিক তাদের সামনে যে কয়লা-কঙ্কাল হাজির করেছিল, সেখানে  প্রিয় মানুষের মুখ তারা খুঁজে পাননি। ফলে প্রিয়জনের লাশ শনাক্ত করতে পারেননি তারা। কবর দেয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে হয় হতভাগ্য এই স্বজনদের। এ অবস্থায় লাশ শনাক্ত করার জন্য বলা হলো, ডিএনএ টেস্ট করতে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু কোথায় করতে হবে, কীভাবে করতে হবে, এ সম্পর্কে কাউকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। এখানে গেলে বলে ওখানে, ওখানে গেলে বলে এখানে না-এভাবে ঘুরে ঘুরে, সাংবাদিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সহযোগিতায় অবশেষে তারা রক্ত দিলেন। স্বজন হারানোর বেদনার ওপর তাদের ওপর যোগ হলো নিখোঁজ স্বজনের অস্তিত্ব প্রমাণ করার দায়িত্ব। কিন্তু ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে সব নিখোঁজ শ্রমিকের পরিচয় ও কবর শনাক্ত করা যায়নি। শুধু ৪২ জনের কবর শনাক্ত হয়েছে। সরকারি হিসাব মতেই তাজরীন শ্রমিকদের ১১টি অশনাক্তকৃত কবর আছে জুরাইন গোরস্তানে। অশনাক্তকৃতদের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দিশেহারা।

নিহত রেহানার ভাই মতিকুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষা দিয়ে আসার সময় আমাদের বলা হলো, আপনাদের পরে জানানো হবে। কিন্তু শ্রম মন্ত্রণালয় বা মালিকপক্ষ কেউই আমাদের কিছু জানাল না। মাস তিনেক পরে ২৯ জানুয়ারি, ২০১৩ তারিখে আমরা পত্রিকা মারফত ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল জানলাম। এরপর আমরা আবার সাংবাদিকদের সাহায্য নিয়েই কবরের নম্বর জানতে পারলাম। কবর জিয়ারতও করলাম। এর বাইরে অনেকের লাশ শনাক্তই করা গেল না।

এরও প্রায় ৭ মাস পর ১৫ জুলাই, ২০১৩ তারিখে আদালতের নির্দেশে ঢাকার মালিবাগের সিআইডি অফিসে আমাদের কাগজপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। সিআইডি অফিস থেকে আমাদের আবারও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য অনুরোধ করল। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তৃতীয়বারের মতোও ডিএনএ টেস্ট করল। দুই বছর হতে চলল, আমাদের হয়রানির কোনো শেষ হলো না। এই টালবাহানা দেখে তো মনে হচ্ছে, আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা চলছে।’

অভিযোগ উঠেছে সরকারের তৎপরতার দুর্বলতা নিয়েও। লাশ শনাক্তকরণে গোলমাল লাগার ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছে সরকার। নিহত ১১১ জনের সবার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের পর ৬২ জন শ্রমিকের লাশ নিয়ে যান স্বজনেরা। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়াই তাদের সমাহিত করা হয়েছে। তখন যদি কারও শনাক্তকরণে ভুল হয়ে থাকে, তাহলে ডিএনএ না মেলার সম্ভাবনাই বেশি। আরও জটিলতা আছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, মৃতদেহ উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রক্রিয়া ত্রুটিসম্পন্ন হলে তা ডিএনএ পদ্ধতির ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটতে দেখা গেছে। একটি বডিব্যাগে দুজন শ্রমিকের লাশের অংশবিশেষ থাকার কারণে একই কবরে দুজন শ্রমিকের ডিএনএ ম্যাচ করার মতো ঘটনা ঘটেছে।

এ প্রসঙ্গে অ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী সায়দিয়া গুলরুখ বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে আমরা গোড়া থেকেই লেগে আছি। এরকম অব্যবস্থাপনার মধ্যে ডিএনএ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ধরা পড়া স্বাভাবিক ছিল এবং তা-ই হয়েছে। আমরা বলেছিলাম, ডিএনএ পদ্ধতির পাশাপাশি পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে অশনাক্তকৃত/নিখোঁজ শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া দরকার। শ্রমিকদের পরিচয় ও ওয়ারিশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ কিছুটা নেয়া হলো এবং তা সফল হলেও শনাক্তকৃতরা এখনো কিছু পেল না। শনাক্তকৃতদের ক্ষতিপূরণ দিতে এমনকি শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর নিহত শ্রমিকদের অনুদান প্রদানের জন্য যথাযথ উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি দেন। কিন্তু সরকারি তদন্তের মাধ্যমে শনাক্তকরণের পর ১০ মাস পার হয়ে গেল, অথচ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এই শ্রমিক পরিবারগুলোর সঙ্গে আজ পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। আমার প্রশ্ন একটাই- প্রধানমন্ত্রীর সময় কবে হবে?’

কিছুই পাননি তারা
একটু সচ্ছলতা অর্থাৎ ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি জমান অধিকাংশ শ্রমিক। গ্রামের দুর্বল অর্থনীতির চাকা তাদের কর্মসংস্থান করতে পারে না। বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন, নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে দূর শহরে এসে নানা ধরনের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়তে হয় গরিব মানুষগুলোকে। তাদের পাশে কেউ থাকে না। বঞ্চনা, মারধর, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা সবই সহ্য করতে হয় নীরবে মুখ চেপে। তাই স্বজন হারানোর পরও তাদের অধোবদনে এসে বলতে হয়, নিজেকে দোরে দোরে ঘুরে সম্পর্কের প্রমাণ দিতে হয়। এভাবে এখানে-ওখানে ঘুরে গরিব এই মানুষগুলো নিজেদের যা আছে তা-ও খরচ করে চলেছেন। কিন্তু সরকার বা মালিক পক্ষ কারও কাছ থেকে এক পয়সাও পাননি তাজরীনের নিহত ১৩ শ্রমিকের দুস্থ পরিবার।

রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছিল লাভলী, লাইলী ও পপি। সম্পর্কে তারা আপন বোন। তিন জনের মধ্যে লাভলী (২২) সবার বড়। তারপর লাইলী (১৮)। আর সবার ছোট পপি (১৫)। যেন এক সুতোয় গাঁথা তিনটি ফুল। একসঙ্গে মিলেমিশে চলাফেরার জন্য গ্রামবাসী তাদের ডাকতো তিন কন্যা বলে। আর বাবা বাবুল মিয়ার তো চোখের মণি ছিল এই তিন কন্যা। পাঁচ মেয়ে আর এক ছেলের সংসার বাবুল মিয়ার। বেশ টানাটানির মধ্যে দিয়েই চলতে হয় তাদের। অভাবের তাড়না থেকে পরিবারকে মুক্তি দিতে লাবণীরা তিন বোন ঢাকা এসে আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টে কাজ শুরু করে।
চাকরিতে যোগদানের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল বাবুল আক্তারের প্রাণের ধন। বয়সের ভার নিয়েও তিনি সন্তানকে হারিয়ে দুই বছর ধরে ঢাকা-রংপুর ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন। দু’ এক মাস পরপরই ধার দেনা করে তিনি চলে আসেন ঢাকায়। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘কী করব। তিন মেয়েকে হারানোর শোক দুনিয়ার সব পেলেও মিটবে না। বাদ বাকি সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছি। শহরে নিয়মিত আসি। যদি মেয়েদের কবরগুলো একটু শনাক্ত করে দেয়। তবু তো কবর জড়িয়ে ধরে অন্তত কেঁদে কেঁদে নিজেকে বলতে পারব যে, আমার মেয়েরা এখানে আছে। রক্ত দিয়েছিলাম পরীক্ষা করতে। বলল যে, একটা লাশের সঙ্গে মিলেছে। কিন্তু সেটা কোন মেয়ে তা তারা বলতে পারেনি। গরিব হওয়ার কারণে মেয়েরা কাজ করতে এসেছিল। গরিব হওয়ার কারণেই এভাবে তারা মারা গেল। এখন গরিব বলেই আমাদের যা প্রাপ্য তা পাচ্ছি না। লাশ পাচ্ছি না, ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না। কারও কাছে গেলে তারা কথা বলে না, বসিয়ে রাখে। কতবার ঢাকা আসা যায়?’

একটি লাশ মেলার সুবাদে বাবুল আক্তার ছোট মেয়ে পপির বিপরীতে আর্থিক সহায়তা পেয়েছিলেন। কিন্তু অন্য মেয়েদের জন্য এখনও কোনো সহায়তা পাননি তিনি। বড় মেয়ে লাভলীর স্বামী জাহেদুলের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। তিনিও কোনো সহায়তা না পাওয়ার কথা জানান।

তাজরীন ফ্যাক্টরি যখন দাউ দাউ করে জ্বলছে, ওই কারখানার শ্রমিক রেহানা তার ভাই মতিকুল ইসলামকে ফোন করেছিলেন। রেহানার বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। গার্মেন্টে তার আইডি নম্বর ছিল ১৭৩৫। তার জাতীয় পরিচয়পত্র নং ছিল ৬০২৭৯০৮১৪৮৪৭১। বেঁচে ফেরার কোনো আশা নেই বুঝে ভাইকে রেহানা অনুরোধ করেছিলেন, তার সাত বছরের সন্তান সুমনকে দেখে রাখার জন্য। মতিকুল নিজেও গার্মেন্ট শ্রমিক ছিলেন, বোনের মৃত্যুর পর আর গার্মেন্টসে ফিরে যাননি। তিনি বোন হত্যার বিচার চান, ভাগনেটাকে মানুষের মতো মানুষ করতে চান। গত মে মাস থেকে বহুবার শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুদানের টাকার খোঁজ করেছেন। বারবার তাকে বলা হয়েছে, চেক প্রস্তুত আছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে চেক বিতরণ করবেন, তাই একটু দেরি হচ্ছে। শেষবার যেদিন মতিকুল যোগাযোগ করলেন, প্রধানমন্ত্রী তখন আসেম সম্মেলনে যোগদান করতে ইতালির মিলান শহরে। এদিকে রাজবাড়ী জেলার কসবা থেকে ঢাকা আসা-যাওয়া করতে করতে মতিকুলের পরিবারের অবস্থা বেহাল।

তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে একমাত্র সন্তান হেনাকে হারিয়েছেন রুকাইয়া বেগম। মেয়েটি ছিল ফুটফুটে এক কিশোরী। বয়স মাত্র ১৭। এই বয়সেই তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে রুকাইয়া বেগম এখনও পাগলপ্রায়। এখানে ওখানে ছুটছেন মেয়ের লাশের সন্ধানে। সুস্থভাবে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেন না। সরকার কি সহযোগিতা করেছে? জিজ্ঞেস করা হলে ‘কারো কাছে কোনো সহযোগিতা পাননি’ বলে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘একটামাত্র মেয়ে তাকে এভাবে হারাতে হবে বুঝলে কোনোদিন কাজে পাঠাতাম না। নিজের রক্ত বেচে মেয়েকে খাওয়াতাম। এভাবে তাকে মরতে দিতাম না। হাতে ধরে তারা আমার মেয়েটাকে মেরে ফেলল। কারখানা থেকে ওরা কেউ বের হতে পারেনি। মালিকের নির্দেশে গেটে তালা দিয়েছিল দারোয়ান। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে মেয়েটা। এখন আমার আর কেউ নাই। সরকার সাহায্য দিয়েছে অনেককে। আমিসহ আরও অনেকে শুধু ঘুরেছি। এখনো কেউ কোনো সাহায্য দেয়নি।’

কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারি থানার সোনাতলি গ্রামের মেয়ে মাহফুজা বেগম। বিয়ে করেছিলেন খুব বেশিদিন হয়নি। তাজরীনের আগুনে পুড়ে তিনি যখন মারা যান তখন তার ছোট্ট পুত্র সন্তানটির বয়স মাত্র ১৮ মাস। এমন বয়সে মাকে হারিয়ে মাসুম এখন বড় হচ্ছে পিতার কোলে। তাজরীন ফ্যাশনসের পুড়ে যাওয়া ভবনটি দেখতে দেখতেই বড় হচ্ছে ছোট্ট শিশুটি। ভবনটির পেছনেই বাবা আবদুল জব্বারের সঙ্গে থাকে মাসুম। পুড়ে যাওয়া ভবনের এত কাছে থাকলেও এই শ্রমিক পরিবারটি কোনো আর্থিক সহায়তা আজও পায়নি।

বাদবাকি সবার গল্পও এই একই রকম। এই তালিকায় আরও আছেন রংপুরের মিঠাপুকুরের শালমারা গ্রামের জাহেদা বেগম। তার স্বামী নাজিমুদ্দিন জানিয়েছেন, বারবার ঢাকা আসার সক্ষমতা তার নেই। এর আগে একবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তাকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেদিন আসতে পারেননি। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতাই তিনি পাননি।

একই থানার জাফরপুর গ্রামের মেয়ে রোজিনা। তার পিতা আনসার আলি জানিয়েছেন, এখনো কোনো সাহায্য তিনি পাননি। তাকে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কেউ ডাকেনি। নিজে থেকে শ্রমিক সংগঠন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, আর আশায় আছেন!

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ জেলার পশ্চিম বাছাইহাটি গ্রামের আহিনুর বেগম। স্বামী রুহুল হান্নান। ছেলের নাম আলী হোসেন। তাজরীন ফ্যাশনসে আহিনুরের আইডি নম্বর ছিল ৬৪৮। তার ছেলে আবুল হোসেন জানান, মায়ের লাশ এখনো শনাক্ত হয়নি। কোনো সাহায্যও এখন পর্যন্ত তারা পাননি।

রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার সারদা কুতুবপুর গ্রাম থেকে আসা আসমা লাশ হয়েছেন তাজরীনে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ২০ বছর। তাজরীন ফ্যাশনসে তার আইডি নম্বর ছিল ১৯৬৮। তার বাবা তফরউদ্দিন এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহযোগিতা পাননি বলে জানান।

জামালপুর জেলা ও থানার কাইজলা গ্রামের সালমার বয়স হয়েছিল ২২। তাজরীন ফ্যাশনসে তার আইডি নম্বর ছিল ৪৬২৩। তার মা ফাতেমা বেগম জানান, এখন পর্যন্ত তারা কোনো সহযোগিতা পাননি। তার পিতা সাহেব আলী অনেক ছুটেছেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।

কুড়িগ্রাম জেলার ঝুমকার চর থানার রহমতপুর গ্রামের আকলিমা মারা গেছেন ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে। আকলিমার বাবা হাসেন আলী জানান, কোনো সহযোগিতা এখন পর্যন্ত পাননি।

চাঁদপুর জেলার উত্তর মতলব থানার দক্ষিণ গাজীপুর গ্রামের শীলাকেও তাজরীনে কাজ করতে এসে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। তার মা জোবেদা খাতুন জানান, এখনও নাকি তাদের নাম তালিকাভুক্তই হয়নি। কবে সহায়তা পাবেন, তা তিনি জানেন না।

সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ার শাহানা শারমিনকেও বরণ করতে হয়েছে একই পরিণতি। তার ভাই পারভেজ আলম এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার কথা জানান।
শুধু নিহত/নিখোঁজ শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণই শেষ কথা নয়। আহত যে শ্রমিকরা পরবর্তীতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাননি, তাদের ক্ষতিপূরণের দাবিও যোগ হচ্ছে। ১৬ বছর বয়সী সুমাইয়া পুড়ে ঝলসে তাজরীন থেকে বেঁচে বেরিয়েছিল। কিন্তু পিজি হাসপাতালের গরিবি চিকিৎসা তাকে বাঁচাতে পারেনি। তার মা আমিরুন্নেছা বলেন, মেয়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে সব শেষ হয়ে গেছে। তা-ও শান্তি পেতাম যদি বুকের ধনকে আগলে রাখা যেত। এখন আমার কিছু নেই।’
ক্ষতিপূরণের ন্যায্য দাবিদার এই আমিরুন্নেছাও।

বিচারের দাবি!
শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, তাজরীন ফ্যাশনসের নিহত/নিখোঁজ ও আহতদের পরিবারবর্গের আরও বড় দাবি রয়েছে। তারা মনে করেন, তাজরীনের অগ্নিকাণ্ড নেহাতই কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল হত্যাকাণ্ড। তোবা গ্রুপের এমডি দেলোয়ার হোসেনের নির্দেশেই আগুন লাগার পর নিরাপত্তাকর্মীরা মালামাল খোয়া যাবার আশঙ্কায় কলাপসিবল গেটে তালা মেরে দেন। ফলে আগুনের মধ্য থেকে শ্রমিকরা বের হয়ে যেতে পারেননি। তাদের পুড়ে মরতে বাধ্য করা হয়েছে। শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের দাবিই নয়, ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। ওই প্রতিবেদনে তাজরীনের মালিক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত কারণে ৩০৪ (ক) ধারায় মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছিল, যার ভিত্তিতে দায়ের করা মামলায় গার্মেন্টটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী ও তাজরীনের চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়। যদিও গার্মেন্টে আগুন লাগার পর নিহতদের পরিবার ও সাধারণ মানুষের দাবি থাকা সত্ত্বেও গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষের কাউকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। উপরন্তু এর এক বছর এক মাস পর পুলিশ গার্মেন্ট মালিক, তার স্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পলাতক দেখিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বর্তমানে দেলোয়ার হোসেন জামিনে মুক্ত আছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারবর্গ তাদের স্বজনদের হত্যার বিচার দাবি করে রাজপথে আন্দোলন করে চলেছেন এখন পর্যন্ত।

দাবির রাজনীতির সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্তরা
মজুরি বাড়ানোর দাবিতেই বেশি আন্দোলন করেন শ্রমিকরা। সেখানে তাদের কিছু দাবি মানা হয়, সরকারের ঘোষণা আসে। পরে এর অনেক কিছু বাস্তবায়ন হয় না। শ্রমিকরা কিছু পান, কিছু হারান। মালিকপক্ষের ভাড়াটিয়া গুণ্ডাদের হাতে শ্রমিকদের মার খাওয়ার খবর গণমাধ্যমে অনেক ছাপা হয়েছে। শ্রমিকের মিছিল মানেই পুলিশের তীব্র প্রতিরোধÑ এই ছবিও সবার পরিচিত। শ্রমিকদের কষ্টকর দাবি আদায়ের এই রাজনীতি তাদের মৃত্যুর পরও শেষ হচ্ছে না। আগুনে পুড়ে মরার পর লাশ পেতে, ক্ষতিপূরণ পেতে, বিচার পেতেও আন্দোলন করতে হচ্ছে শ্রমিক পরিবারগুলোকে। তাদের জন্য সবকিছুই কঠিন। এমনকি আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার পর, সারা পৃথিবীর মানুষ জানার পরেও তারা আন্দোলন করেও হয়রানি ব্যতিরেকে এক পয়সাও পান না।

এদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, অতীতেও এভাবে নিখোঁজ শ্রমিকের দাবিকে আমলে নেয়া হয়নি। গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা শহিদুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল স্পেক্ট্রাম ভবন ধসে কিছুসংখ্যক শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছিল। আজ দশ বছর পরেও তাদের দাবির কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের পরে রানা প্লাজা ধসে নিখোঁজ শ্রমিকদের বিষয়টিও রয়েছে অমীমাংসিত। মৃত শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আত্মসাৎ করতে মালিকেরা খুব তৎপর। তারা কাজ করিয়ে শ্রমিকদের বেতন দেয় না। শ্রমিকরা যেন এগুলো ঠেকাতে আন্দোলন না করতে পারে, তাই ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেয় না। এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমাকৃত শ্রমিকদের অনুদান ও ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝিয়ে দেয়া হোক। শ্রমিকের অনুদানের অর্থ রাজভাণ্ডারে, মালিক কারাগারের বাইরে ঘুরে বেড়ায়, আর শ্রমিকরা থাকে অর্ধাহারে, অনাহারে। এই অন্যায় আমরা মানি না। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। সরকার যদি দ্রুত এই হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় না আনে এবং দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা না মেটায়, তাহলে আরও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

এ প্রসঙ্গে শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন।

সচিব মিকাইল শিপারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকেও পাওয়া যায়নি। তার অফিস থেকে কী বিষয়ে কথা তা জেনে নিয়ে পরে বলা হয়, ‘তিনি নেই। যুগ্ম সচিবদের সঙ্গে কথা বলুন।’

যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও উন্নয়ন) মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে যুগ্ম সচিব (শ্রম) ফয়জুর রহমান কাজ করেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

যুগ্ম সচিব ফয়জুর রহমানকে খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, তিনিও দেশের বাইরে, চীনে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় আমরা যোগাযোগ করি উপসচিব (শ্রম) আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি তাজরীনের বিষয়টি জানি না। এটা সরাসরি ফয়জুর রহমান সাহেবের সহকারী দেখেন। তার সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে ফোন করুন।’

পরবর্তীতে তাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘দ্রুতই ক্ষতিগ্রস্তরা সাহায্য পাবেন, এটা নিশ্চিত করছি। তবে সেটা ১০ জন। এর বাইরে আমি খুব বেশি কিছু বলতে পারব না।’

শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন ছিল, ‘তাজরীনের নিহত/নিখোঁজ পরিবারগুলো যে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না, এ নিয়ে আপনারা কী করছেন?’ এর সাধারণ একটি উত্তরের জন্য আমাদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি। মন্ত্রণালয় থেকে এরকম সাধারণ একটি তথ্য বের করতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমকেই যদি এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, তাহলে নিহত/ নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারবর্গ কী পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। সূত্র: সাপ্তাহিক

 

 

এমআর

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes