শনিবার , ২৬ মে ২০১৮
শিরোনাম

মিডিয়ার দ্বৈতনীতি

Mediaগোলাম কিবরিয়া
বর্তমান যুগ মিডিয়ার যুগ। বর্তমান বিশ্বকে এক হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে মিডিয়া। বর্তমান যুগকে তথ্য, বিজ্ঞান ইত্যাদি নামে যতোই অভিহিত করা হোক না কেন এ সব গুলোর কল্যান এবং অকল্যান মানুষের কাছে পৌছে যাচ্ছে মিডিয়ার কারণে। পৃথিবীর যে কোন দেশের ছোট্র কোন বিষয়ও বাদ যাচ্ছে না মিডিয়ার জন্য। মানুষের ঘর এমনকি বিছানা থেকে মহাকাশের আবিষ্কার পর্যন্ত সকল অবস্থাই আজ মানুষের কাছে পরিষ্কার করে দিচ্ছে মিডিয়া। একটি দেশের সাথে অন্য দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন মিডিয়া বা গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকে তেমনি একটি দেশের সাথে অন্য দেশের যুদ্ধ বাধাতেও মিডিয়ার জুড়ি নেই। মিডিয়ার কারনেই মালালার মতো বিতর্কিত ব্যক্তি আজ নোবেল লরিয়েট, লাদেনের মতো তথাকথিত জঙ্গি সারা বিশ্বে আতংক, মুসলিম দেশগুলোতে নির্যাতিত হয়েও মুসলিমরা সন্ত্রাসী আর সন্ত্রাসের জনক ইজরাইল বা আমেরিকা তথাকথিত প্রগতিশীল। আজকের বিশ্বে যুদ্ধের ডামাডোলে মিডিয়ার যেমন হাত আছে তেমনি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্ঠায় মিডিয়ার অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই মিডিয়া বা গনমাধ্যমকে একটি দেশের চতুর্থ অর্গান বলা হয়।
বাংলাদেশের মিডিয়াঃ

বাংলাদেশের মিডিয়াও পৃথিবীর অন্য দেশের মতো এগিয়ে চলছে। শুধু তাই নয় এদেশের মিডিয়ার কর্মকান্ড বা কার্যক্রম বিশ্বের উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পার হয়ে এ পর্যন্ত এসেছে। ৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল প্রতিষ্ঠা লগ্নে ৪টি পত্রিকা রেখে বাকী পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন অবশ্য এত টেলিভিশন চ্যানেল বা অনলাইন মিডিয়া ছিল না। পরবর্তীতে এ সকল পত্রিকাগুলো পুনরায় চালু হয় এবং বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারী উদ্দোগে প্রায় ২৫টি টেলিভিশন চ্যানেল, ৩০এর অধিক জাতীয় পত্রিকা এবং শতাধিক অনলাইন নিউজ এজেন্সি চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে সারাদেশ এবং বিশ্ব চলমান বিষয়গুলি জানার সুযোগ পাচ্ছে। যদিও বর্তমান সরকার তাদের সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে ২টি টেলিভিশন চ্যানেল এবং একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে। একজন সম্পাদককে দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দীকরে রেখেছে।
বাংলাদেশের মিডিয়া কেমনঃ

অবস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো বিশ্বে পরিচিত হলেও নিরপেক্ষতার দৃষ্টিতে সর্বনিম্ন অবস্থানে দাড়িয়ে আছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে সকল ক্ষেত্রে যেমন দলগত বিভেদ জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে তেমনি মিডিয়া নামক নিরপেক্ষ এই জগতেও এর ভিন্নতা হয়নি। বরং নিরপেক্ষতার সকল সূত্র ভুলে জাতিগত বিভেদ স্পষ্ট করতে সবচেয়ে বেশি ন্যাক্কার জনক ভুমিকা পালন করছে মিডিয়া। সাদাকে সাদা কালোকে কালো, ভালোকে ভালো মন্দকে মন্দ বলার সৎসাহস তারা হারিয়ে ফেলেছে। এক্ষেত্রে কিছু ঘটেছে সরকারের চাপে আর বেশিরভাগ হয়েছে নৈতিকতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারনে। অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া এই মিডিয়া জাতিকে নতুন এবং সুন্দর কিছু দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে সবাই নষ্ট হয়ে যায়নি। সবাই কোনদিনও নষ্ট হয়ে যায়না। কিছু সবসময়ই ভালো থাকে । তবে এই ভালোরা নষ্টের চাপে পড়ে হাহুতাশ করতে থাকে, কষ্ট পেতে থাকে কিন্তু কিছুই করতে পারে না।
বর্তমান সময়ের মিডিয়ার ভুমিকা পর্যলোচনা করার জন্য অনেক দূরের ইতিহাস আলোচনায় নিয়ে আসার প্রয়োজন পড়ে না। গত কিছুদিনের ঘটনা দেখলেই এর মুজেজা বোঝা কারো জন্য কঠিন হবে না। এই যেমন কয়দিন আগে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানি ড. পিয়াস করিম সাহেব মারা গেলেন। টেলিভিশন টকশোতে সত্য কথা বলার ক্ষেত্রে যে কয়জন ব্যক্তি জনপ্রিয় ছিলেন তাদের মধ্যে ড. পিয়াস করিম অন্যতম। কিন্তু মারা যাওয়ার পর তিনি হঠাৎ করেই যুদ্ধাপরাধী হয়ে গেলেন। তার লাশ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য শহীদ মিনারে নিতে চাওয়া হলে কিছু জোকার ষ্টুডেন্ট শহীদ মিনারে তার লাশ প্রতিহত করার ঘোষনা দিয়ে আন্দোলন করল। আর কিছু টেলিভিশন এবং পত্র পত্রিকা তাদের সাক্ষাতকার, আলোচনা, যুক্তি ইত্যাদি জাতির সামনে তুলে ধরার মহান(!) দায়িত্ব তুলে নিল। ৭১ টেলিভিশনের একটি টকশোতে বাপ্পাদিত্য বসু বলল, তারা দেশ স্বাধীন করেছে এবং পিয়াস করিমের মতো যুদ্ধাপরাধী(!) কে শহীদ মিনারে আসতে দেয়া হবেনা। বাপ্পাদিত্য বসু কে? সে মুক্তিযুদ্ধ করেছে নাকি তার গোষ্ঠীতে কোন মুক্তিযোদ্ধা আছে? ৭১ টেলিভিশনের মতো আরও কয়েকটি টেলিভিশনও তাদের আন্দোলন(!) কে মিডিয়াতে অনেক বড় করে প্রচার করলো। দেখা গেলো অল্প কিছু ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীর আন্দোলন এবং মিডিয়ার কল্যানে(!) ড. পিয়াস করিমের লাশ আর শহীদ মিনারে আনা গেল না।

অধ্যাপক গোলাম আজম সাহেবের জানাজা নিয়ে মিডিয়ার নাটক জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে এবং কষ্ট দিয়েছে। কয়েক লক্ষ লোকের সমাগম হওয়া জানাযাটি কোন মিডিয়াতে তেমন ফলাও করে প্রচার হয়নি। বরং কোন এক জুতা নিক্ষেপের(!) সাজানো ঘটনা বড় করে মিডিয়ায় স্থান করে নেওয়ার জোর চেষ্টা করা হয়েছে। গনজারন মঞ্চ নামক একটি নৈতিকতা বিহীন আন্দোলনতো মিডিয়াই সৃষ্টি করলো। কয়েকজন লোক একত্রিত হওয়াকে লক্ষ লোক বলে চালিয়ে দেওয়া আর লক্ষ লোকের সমাগমকে প্রচার না করা শুধু নিরপেক্ষতা লংঘনই নয় জাতিকে বিপদে ফেলার অপচেষ্টার সামিল। মাঝে মধ্যে গনজাগরন মঞ্চে লোক সমাগম না হলে তারা লাইভ প্রচার করে না, অপেক্ষা করে বেশি লোক উপস্থিতির জন্য যাতে তারা লজ্জায় না পরে।

এভাবে আর কতদিন? শুনেছি, গোলাম আজমের জানাযার দিন একটি চ্যানেলের এক সাংবাদিক তার উর্দ্ধতন কর্তাকে নিউজের ভ্যালুর কথা বিবেচনা করে সরাসরি জানাযা প্রচারের কথা বললে তিনি নাকি বলেন, অধ্যাপক গোলাম আজমের মত লোকের জানাযা প্রচার না করা বা এসব ক্ষেত্রে একপক্ষীয় প্রচার করাই নাকি সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে তাদেরকে শিখানো হয়েছে। আর গোলাম আজমের জানাযা সম্প্রচার করা নাকি সাংবাদিকতার এথিক্সেও পড়ে না।

তাহলে সাংবাদিকতায় এথিক্স টা কি? নাকি সাংবাদিকাতার আড়ালে হলুদ সাংবাদিকতাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। আর সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার এই মহান পেশাকে কলংকিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই অল্পকিছু সাংবাদিকের অপতৎপরতা বন্ধ করার বিকল্প নেই। তবে এতো সহজে এটা সম্ভব হবে তা ভাবলে ভুল হবে। জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে বিষবাস্প ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তা এত অল্প সময়ে নি:শেষ করা যাবেনা। সবাইকে সজাগ এবং সচেতন হওয়ার পাশাপাশি নিজেদেরকেই মিডিয়ার ভূমিকা পালন করতে হবে। গোয়েবলস যেমন একটি মিথ্যাকে সত্যের সাথে মিলিয়ে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার থিউরি দিয়ে গেছে এরাও মিথ্যাকে সত্যের সাথে মিলিয়ে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।

তবে এটি বেশিদিন চলতে পারে না। সত্যকে সূর্যের আলোর মতো সামনে বের হয়ে আসতে হবে। তখন এই সকল দ্বৈতভূমিকার সাংবাদিক নামের অসাধু মানুষগুলোকে জাতির সামনে উচিৎ শিক্ষা দিতে হবে, যাতেে এরা ভবিষ্যতে সাংবাদিকতার নাম করে এই মহান পেশাকে আর কলংকিত করতে না পারে।
গোলাম কিবরিয়া
মানবাধিকার কর্মী ও কলামিষ্ট

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes