রবিবার , ২৭ মে ২০১৮
শিরোনাম

গোলাম আযমের মৃত্যু-পরবর্তী জামায়াতি রাজনীতি

Gaffarআবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

মৃত্যু হওয়ায় বহু আগেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম জামায়াতের আমিরের পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন অথবা বার্ধক্যহেতু অবসর নিয়েছিলেন। জামায়াত সূত্র থেকেই তখন জানা গিয়েছিল, দলের তরুণ নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশ, যাঁরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তাঁদের তরফ থেকে গোলাম আযমসহ বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত নেতার ওপর চাপ ছিল, তাঁরা যেন নেতৃত্ব থেকে সরে যান এবং দলকে তাঁদের অপকর্মের দায়-দায়িত্ব বহন থেকে মুক্তি দিয়ে ক্লিন স্লেটে দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ দেন।

কিন্তু পাকিস্তানের জামায়াত, তাদের পৃষ্ঠপোষক আইএসআই, বিশেষ করে বাংলাদেশের জামায়াতের বড় আর্থিক পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরবের সমর্থন থাকায় গোলাম আযমসহ জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতারা দলের নেতৃত্বে থেকে যান। পরে দলের নবীন ও প্রবীণ অংশের মধ্যে একটা কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা উদ্ভাবিত হয়। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গোলাম আযমই ছিলেন দেশে-বিদেশে সমালোচনার বড় টার্গেট। বাংলাদেশে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনেরও মুখ্য স্লোগান ছিল ‘গোলাম আযমের ফাঁসি চাই।’

সুতরাং জামায়াতের অন্য নেতারা ধরে নিয়েছিলেন, গোলাম আযম দলের আমিরের পদ থেকে সরে গেলে দেশে হয়তো জামায়াতবিরোধী বিক্ষোভের ঝড় একটু কমবে। জাহানারা ইমামের ঘাতক দালাল নির্মূল অভিযানের সময় গোলাম আযমের পক্ষে ঘরের বাইরে আসা কষ্টকর ছিল। ঢাকার যে বায়তুল মোকাররম মসজিদে সরকার তাঁর জানাজা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, সেই মসজিদ থেকে তিনি জনগণ তথা সাধারণ মুসল্লিদের তাড়া খেয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। লন্ডনের ইস্ট লন্ডন মসজিদেও তিনি পরে আর সাহস করে নামাজ পড়তে আসেননি।

এই গোলাম আযম জামায়াতের তরুণ নেতা-কর্মীদের একাংশের এবং পরিস্থিতির চাপেই দলের প্রধান নেতার পদ থেকে সরে যান। কিন্তু তাঁর সঙ্গের অন্যান্য যুদ্ধাপরাধী নেতা নেতৃত্বে থেকে যান। গোলাম আযম নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ায় তাঁরা হয়তো এই ভেবে মনে মনে সন্তোষ অনুভব করছিলেন যে মানুষের ক্রোধ ও ঘৃণার প্রধান টার্গেট সরে যাওয়ায় এখন জনগণের ঘৃণা ও ক্রোধ থেকে অনেকটা রেহাই পাওয়া যাবে।

গোলাম আযমের মৃত্যু-পরবর্তী জামায়াতি রাজনীতি

তাঁদের এই আশা পূর্ণ হয়নি। এই নেতাদের একজনের কাছ থেকেই আমি পরবর্তী সময়ে শুনেছি, তাঁদের আশা পূর্ণ না হওয়ার একটা বড় কারণ, গোলাম আযম দলের আমির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দিলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে ওই পদে থেকে যান। দল চলত তাঁর অঙ্গুলি হেলনে। কারণ তাঁর সৌদি ও মিডল ইস্টার্ন কানেকশনই ছিল জামায়াতের রাজনীতির বড় মূলধন। সুতরাং নামে দলের আমির যে-ই হোন, গোলাম আযম ছিলেন আমিরে আযম। সিন্দবাদের দৈত্যের মতো তিনি বৃদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু দলের কাঁধ থেকে নামেননি। মৃত্যু পর্যন্ত জাঁকিয়ে বসেছিলেন।

গোলাম আযম ছিলেন চরিত্রে ধূর্ত এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির। বাংলাদেশে (পাকিস্তান আমলে) জামায়াতের প্রথম বাংলাদেশি আমির লিবারেল চরিত্রের মওলানা আবদুর রহিমকে পদ থেকে হটিয়ে উগ্রপন্থীদের নিয়ে তিনি দল সংগঠিত করেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ সংঘটনে তাঁর ভূমিকাই ছিল মুখ্য। তিনি ঢাকার তৎকালীন গভর্নর হাউসে টিক্কা খান, রাও ফরমান আলী প্রমুখ গণহত্যার নায়কদের সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক করেছেন এবং এই হত্যা পরিকল্পনা প্রণয়নে অংশ নিয়েছেন। ফলে যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাঁকে পাকিস্তানে পালাতে হয়েছিল।

পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে দৃঢ় কানেকশনের জন্য গোলাম আযম ছিলেন বাংলাদেশের জামায়াতের বড় সম্পদ। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ ও বৃদ্ধ বয়সের কার্যকলাপ তাঁকে দলের জন্য লায়াবিলিটি করে তুলছিল। ফলে তাঁর অঘোষিত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দলের তরুণ অংশে অসন্তোষ ধূমায়িত হলেও বাইরে এর প্রকাশ ঘটেনি। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে জামায়াত গোলাম আযমের সম্মতি নিয়েই বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। বিএনপি সরকার তাঁকে নাগরিকত্বের মামলায় জেলে পুরেছিল, এই রাগ তাঁর ছিল।

নির্বাচনের গোটা সময় জামায়াত তাঁর সমর্থকদের বিএনপিকে ভোট না দিতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু ভোট পর্বের ঠিক আগে গোলাম আযম জেলায় জেলায় গোপন নির্দেশ পাঠান, দলের সমর্থকরা যেন বিএনপিকেই ভোট দেয়। ফলে দলের তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। শোনা যায়, গোলাম আযমের এই হঠকারিতা নিয়ে দলের মজলিসে শুরায় তুমুল বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছিল।

ব্রিটেনে স্যার উইলস্টন চার্চিল ছিলেন টোরি দলের অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর অঙ্গুলি হেলনে দল চলত। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে কথাবার্তা ও কার্যকলাপে অসঙ্গতি দেখা দিলে তাঁর নেতৃত্ব দলের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি একসময় খেই হারিয়ে প্রকাশ করে ফেলেন যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ব্রিটেনের মিত্রপক্ষ এবং মিত্রপক্ষের কাছে হিটলারের জার্মানি পরাজিত হতে যাচ্ছে, তখন চার্চিল গোপনে ব্রিটিশ সেনাপতির কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন যে সোভিয়েত সৈন্যদের ঠেকানোর জন্য ব্রিটিশ সেনাপতি যেন পরাজিতপ্রায় জার্মান সৈন্যদের হাতে অস্ত্র জোগান। মিত্রের সঙ্গে শঠতার এই তথ্য স্বয়ং চার্চিলের মুখ থেকে ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর টোরি দল এতই বিব্রত হয়ে পড়ে যে তারা চার্চিলকে দলীয় নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে অ্যান্থনি ইডেনকে ওই পদে বসিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

গোলাম আযমকে নিয়ে বাংলাদেশে জামায়াত একই বিপদে পড়েছিল। তিনি দলের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু তাঁর স্বেচ্ছাকৃত যুদ্ধাপরাধ এবং বৃদ্ধ বয়সের হঠকারিতাপূর্ণ বক্তব্য ও কার্যকলাপকে জামায়াতকে কিছুতেই রাহুমুক্ত হতে দিচ্ছিল না। তিনিও ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত অবস্থায় জামায়াত কর্মী ও সমর্থকদের গোপনে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিএনপিকে নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য। জামায়াতের জন্য গোলাম আযমের নেতৃত্ব ক্রমেই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লন্ডনে বসেও ব্যাপারটা টের পেতে আমার দেরি হয়নি।

বাংলাদেশি-অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডন এখন জামায়াতের একটি প্রধান ঘাঁটি। বহু তরুণ জামায়াতির সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় আছে। গোলাম আযমের মৃত্যুর পর তাঁদের একজনের প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগ আমার হয়েছে। তরুণ জামায়াতি বলেছেন, গোলাম আযমের মৃত্যুতে তাঁরা অবশ্যই বাহ্যিকভাবে শোক প্রকাশ করবেন এবং নেতার প্রতি আনুগত্য জানাবেন। কিন্তু এই বয়োবৃদ্ধ নেতার মৃত্যু দলের তরুণ অংশে স্বস্তির ভাবও এনেছে। জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিচার শুরু হলে এই তরুণ নেতারা মনে মনে আশা পোষণ করেছিলেন, বিচারে দণ্ডিত হয়ে এই নেতারা নেতৃত্ব থেকে সরে গেলে দল তাদের অতীতের কার্যকলাপের দায়মুক্ত হবে, নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে বেঁচে যাবে এবং দল নতুন নেতৃত্বে নতুনভাবে নতুন কর্মসূচি নিয়ে সংগঠিত হতে পারবে।

আমি এই তরুণ জামায়াতির কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিই না। আমার একটা ধারণা, কাদের মোল্লার ফাঁসি থেকে শুরু করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড হওয়া পর্যন্ত দলের নেতাদের নির্দেশে দেশে কিছু সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘটিত হলেও তা যে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল তার হয়তো একটা কারণ, একমাত্র বেতনভোগী ক্যাডার ছাড়া দলের তরুণ নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশই ব্যাপক সহিংসতায় নামতে উৎসাহ বোধ করেনি। তারা বড় সমাবেশ ঘটায়। বড় সন্ত্রাসে যায় না। গোলাম আযমের জানাজায়ও হয়তো এরই প্রমাণ মিলেছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে মাত্র দুটি ককটেল ফেটেছে। সরকার যদি এই জাতীয় মসজিদে একজন দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীর জানাজা অনুষ্ঠিত হতে না দিত, তাহলেও ব্যাপক সহিংসতা ঘটত বলে আমার মনে হয় না।

সরকার যদি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদান দ্রুত শেষ করত তাহলে নিজেরা দায়মুক্ত হতো এবং জামায়াতকেও অতীতের পাপের দায়মুক্ত হওয়ার কাজে সাহায্য জোগাতে পারত। কিন্তু বর্তমান সরকার কাদের বুদ্ধি-পরামর্শে চালিত হচ্ছে তা আমি জানি না। তারা দেশবাসীর এক বিরাট অংশের দাবি মেনে জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে না; আবার যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিচার ও দণ্ডদান ঝুলিয়ে রেখে জামায়াতের তরুণ প্রজন্মের নেতা-কর্মীদের অতীতের দায়ভারমুক্ত হয়ে নতুনভাবে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করছে না। এরপর গোলাম আজমের জানাজার ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা দেশবাসীর জন্য রীতিমতো বিভ্রান্তিকর।

এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার জামায়াতকে দণ্ডিত ও বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধী নেতাদের নিয়ন্ত্রণে ও পরিচালনায় রাখার ব্যবস্থা করে দিল। যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদা গোলাম আযমের বিচার, দণ্ডদান এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যুতে সরকার যে ভূমিকা দেখাল, তাতে জামায়াতের পুরনো ও যুদ্ধাপরাধী নেতাদের কর্তৃত্বাধীনেই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেল। নতুন প্রজন্মের জামায়াতের নেতা-কর্মীরা নিরুৎসাহিত হলো। ফলে অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো ছুতানাতায় জামায়াত যদি অতীতের সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক রাজনীতিতে আবার অবতীর্ণ হয় তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।

গোলাম আযম যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত শত্রু ছিলেন এর প্রমাণ মেলে পাকিস্তানে ঘটা করে তাঁর গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবং তাঁকে পাকিস্তানের পরম বন্ধু বলে ঘোষণা করায়। কেবল বাংলাদেশের সরকার তাঁর বিচার ও দণ্ডদানের পরও তাঁকে জাতির এবং মানবতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে রাখতে পারল না। এর খেসারত এই সরকারকে একদিন দিতে হবে।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes