Friday , 3 April 2020
শিরোনাম
ভীরুতা নয়, রুখে দাঁড়াও

ভীরুতা নয়, রুখে দাঁড়াও

বছর দুই আগে কোন এক সকালে সংবাদ মাধ্যমগুলোর  শিরোনাম হয়েছিল, “ছিনতাইকারীর হাত থেকে পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নিহত”।
হ্যা, আমি সেই আবু তালহার কথা বলছি, বলছি সেদিনের সেই সাহসী বালকের কথা।

প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে টিকাটুলীর নিজ বাসা থেকে বের হন তালহা। সবে মাত্র ভোর হয়েছে, চারদিকে এক ধরণের চাপা নীরবতা, রাজপথ অনেকটাই জনমানব শূন্য। হঠাৎ কারো চিৎকার শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখেন, দুজন পথচারী ছিনতাইকারী কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছে। সাহায্যের জন্য তারা চিৎকার করছে। কোন কিছু না ভেবেই একাই ছুটে যান আবু তালহা, লড়াই করে যান তিন ছিনতাইকারীর সাথে। পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া কয়েকজনের নিকট চিৎকার করে সাহায্য চাইলেও এগিয়ে আসেনি কেউ। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত আবু তালহাকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে কিন্তু ছুরিকাঘাত ঘটনা বিধায় তারা তাকে পাঠিয়ে দেন ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে। সেখানে নেয়ার কিছুক্ষন পরেই মারা যান আবু তালহা। চিন্তা করা যায়, মানুষ হিসেবে আমরা  কতটা নিষ্টুর আর বর্বর!

বছর দুই পরে গতকালের সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনাম, “শতখানেক লোকের সামনে যুবককে কুপিয়ে হত্যা করলো সন্ত্রাসীরা, স্ত্রী একা লড়াই করেও বাঁচাতে পারেনি স্বামীকে”। একবার ভেবে দেখুন তো, কতটা নিষ্ঠুর হলে আর কতটা বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী হলে এরকম ঘটনা দাঁড়িয়ে থেকে উপভোগ করা যায়! উপভোগ ছাড়া আর অন্য কোন শব্দ  খুঁজে পেলামনা জঘন্য এই বিষয়কে আখ্যায়িত করতে। আফসোস, সেদিন দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষগুলোর মাঝে অন্তত একজনও যদি তালহা হয়ে উঠতেন! ভিকটিম ছেলেটি  হয়তোবা আজ বেঁচে যেতেন।

65162985_313736359516125_5595502334034575360_nআসেন একটু পেছনে যাই, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজার কথা মনে আছে? প্রকাশ্য দিবালোকে চাপাতি দিয়ে মারাত্নকভাবে কুপিয়ে তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েছিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম। আমরা আমজনতা তখনও দাড়িয়ে থেকেছি,  মোবাইলে ভিডিও ধারনে ব্যাস্ত রেখেছি নিজেকে, এগিয়ে যাইনি একজনও।

মনে আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কণিকা ঘোষ এবং ঢাকার স্কুল ছাত্রী রিষা হত্যাকাণ্ডের কথা? ভাগ্যক্রমে জীবনযুদ্ধে লড়াই করে সিলেটের খাদিজা সেদিন বেঁচে গেলেও সেই সৌভাগ্য আসেনি কণিকা ঘোষ এবং রিষার ভাগ্যে।

আসেন আরেকটু পেছনে যাই, বিশ্বজিৎ এর কথা মনে আছে সবার! প্রকাশ্যে কুপিয়ে কুপিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দেয়া হয়েছিল যে ছেলেটাকে! আফসোস, সেদিনও কেউ এগিয়ে আসেনি তাকে বাঁচাতে। শতখানেক মানুষের সামনে কুপিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে দেয়া হয়েছিল এই বিশ্বজিৎ কে। বিশ্বজিৎ এর মা আজও ছেলে হারানোর সেই ব্যাথা ভুলতে পারেনি, ভুলতে পারেনি রক্তাক্ত সেই শার্ট আর পড়ে থাকা বিশ্বজিৎ এর ক্ষতবিক্ষত নিথর সেই দেহ।

কোন একটি ঘটনা ঘটাকালীন তা দাঁড়িয়ে থেকে অবলোকন করার চাইতে প্রতিবাদ করে অসহায় মানুষটিকে সাহায্য করাটাই কি শ্রেয় নয়। আজ আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন না , কাল আপনার সাথেও ঠিক এমনটিই হবে, এটাই যে প্রকৃতির নিয়ম। টিট ফর ট্যাট। অবশ্য এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রও তার দায় এড়াতে পারেনা, রাষ্ট্র তার ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য তার সব নাগরিককে প্রতিবাদহীন প্রতিরোধহীন পাথুরে মূর্তিতে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। রাষ্ট্র বলছে, ভয় পাও, ভয় পাও। আর আমরা আমপাবলিক ভয় পেতে ভালোবাসছি। এটাই গল্প। এই গল্পটি এখন সৃষ্টিশীল, অভিনব এবং অনন্য।rifatএ গল্পের বিপরীতে গিয়েই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে, হতে হবে একজন আবু তালহা। নতুবা এ সমাজ বুঝি গোল্লায় গেল!

বিচার ব্যবস্থায় আস্থা রাখার কথা বলবেন! আসেন তো দেখি বিশ্বজিৎ হত্যার কি বিচার হয়েছিল? প্রধান আসামি ১.মশিউর রহমান সুমন ২.ইমদাদুল হক ৩.মামুন ৪.মাহফুজুর রহমান নাহিদ ৫.সৈকত ৬.পাভেল ৭.তাহসিন ৮.রফিকুল ইসলাম শাকিল।  রফিকুল ইসলাম শাকিল ব্যাতিত মৃত্যদন্ড থেকে রেহাই দেয়া হয় বাকি ছয় ছাত্রলীগ কর্মীকে, মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় আরো তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে। এই বিচার ব্যবস্থায় আস্থা রাখার কথা আপনি বলবেন?

এরপরেও কি বলবেন গতকাল সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত রিফাত শরীফ এবং তার পরিবার সুষ্ঠ বিচার পাবেন? গ্রেফতার হওয়া আসামিরা কঠোর বিচারের সম্মুখীন হবে? দীর্ঘ সেই অপেক্ষাতে আজ থেকে নাহয় আমরা থেকেই গেলাম?
আর কত পিছু পা! ভীরুতা নয়, এবার তবে রুখে দাড়াও।