Tuesday , 4 August 2020
শিরোনাম
ইতালির রক্তের দেনা: ওমর আল-মুখতার

ইতালির রক্তের দেনা: ওমর আল-মুখতার

সামাদ আযাদ
——————————————————–
একজন শিক্ষক ছিলেন তিনি। আল কুরআন‌ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরম পরিবেশ ছেড়ে চলে এলেন বেনগাজীর অজো লোকালয়ে। সক্রেটিসের মত বসে পড়তেন পথে। জমায়েতে শুরু করতেন অসাধারণ দরস। বিশ্বাসে ছিলেন সালাফ ও তাসাউফের মধ্যপন্থায়। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে সহজ সরল কর্মনিষ্ঠ এ মানুষটি হয়ে উঠলেন আফ্রো-এশিয়ার নির্যাতিত আরবদের সংগ্রামী নেতা। ঔপনিবেশিক বেনিয়াদের ঘুম হারামকারী গেরিলা যোদ্ধা।

১৯২২ সাল। ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় এলো। ১৯২৩ সালে মুসোলিনির সরকার ‘রিকনকুইস্তা’ বা পুনর্বিজয় নামে একটি প্রকল্প শুরু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো উপায়ে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ত্রিপলী এবং বেনগাজীর কলোনিগুলোকে পুনরায় ইতালির অধীনস্থ করা। জেনারেল পিয়েত্রো বাদুলিওর নেতৃত্বে ফ্যাসিস্ট ইতালীয় বাহিনী নতুন করে সম্পূর্ণ লিবিয়া দখলের জন্য অভিযান শুরু করে।

প্রতিরোধ সৃষ্টি না করে আমির ইদ্রিস এ সময় মিসরে চলে যান। ওমর আল-মুখতারের ছোটবেলার পৃষ্ঠপোষক, আরেক গুরুত্বপূর্ণ সেনুসি নেতা শেরিফ আল-গারিয়ানিও ইদ্রিসের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। থেকে গেলেন ওমর আল-মুখতার। ঔপনিবেশিক ইতালির বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন তিনি।

চাদে, মিসরে এবং ইতালির বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে তার সামরিক জ্ঞান বেশ ভালো ছিল। তাছাড়া শিক্ষক হিসেবে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করার কারণে, এ অঞ্চলের ভৌগলিক গঠন সম্পর্কেও তিনি জ্ঞাত ছিলেন। তার নেতৃত্বে মুজাহিদরা নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে এবং একের পর এক ইতালিয়ানদের ঘাঁটি আক্রমণ করতে থাকে। তাদের রাত্রিকালীন গেরিলা আক্রমণগুলোর কারণে তারা লিবিয়ানদের কাছে ‘নিশাচর সরকার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

সেখানে অবস্থানকালে এক ইতালিয়ান কর্মকর্তা তাকে ইতালিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং লিবিয়াতে ফিরে এসে যুদ্ধের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ওমরের মুজাহিদ বাহিনীকে দমন করতে না পেরে ইতালিয়ান বাহিনী স্থানীয় লোকালয়ের উপর আক্রমণ শুরু করে। স্থানীয় জনগণ যেন ওমরকে সাহায্য না করতে পারে, সেজন্য ইতালিয়ানরা জনগণ এবং তাদের গবাদিপশুর উপর বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করত, লোকালয়ে বিষাক্ত গ্যাস ছিটিয়ে দিত, পানির কূপগুলোতে বিষ ঢেলে দিত, বন্দীদেরকে নির্যাতন করার পর প্লেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিত এবং রাজবন্দীদেরকে জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করত।

ইতালিয়ানরা ধীরে ধীরে জাগবুব, জালো, ঔজেলা এবং ফেজ্জানের সবগুলো মরুদ্যান দখল করে নিলে ওমর আল-মুখতার জাবাল আল-আখদার তথা গ্রিন মাউন্টেইন্স এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তখন তিনি দারনায় ইতালিয়ান বাহিনীর উপর আক্রমণ করেন। দারনায় দুদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধে ওমর আল-মুখতারের অসাধারণ রণকৌশলের কাছে ইতালিয়ানরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তারা তাদের কামান, অস্ত্রশত্র এবং গাড়ি-ঘোড়া ফেলে পালিয়ে যায়। দখলকৃত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ওমরের বাহিনী নব উদ্যমে ইতালিয়ানদের বিভিন্ন ক্যাম্পে গেরিলা আক্রমণ চালাতে শুরু করে। ধূসর মরুভূমির দিগন্ত ভেদ করে হঠাৎ করে তারা আবির্ভূত হতো, তাদের গেরিলা আক্রমণে হতভম্ভ ইতালিয়ানরা নিজেদেরকে গুছিয়ে ওঠার আগেই আবার তারা নিরুদ্দেশ হয়ে যেতো।

১৯২৪-২৫ সালে কয়েকটি যুদ্ধে ওমর আল-মুখতারের বাহিনী ইতালিয়ানদের হাতে পরাজিত হলেও, শীঘ্রই তিনি তার রণকৌশলে পরিবর্তন আনেন। ১৯২৭-২৮ সালের দিকে ওমর সেনুসি যোদ্ধাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন এলাকায় পৃথক পৃথকভাবে যুদ্ধরত দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করেন। তারা অকস্মাৎ ইতালিয়ান বাহিনীর বিভিন্ন চেকপয়েন্টে, তাদের রসদ বহনকারী গাড়ির বহরে এবং তাদের স্থাপিত টেলিগ্রাফ লাইনে আক্রমণ করেই আবার আত্মগোপন করতেন। সে সময়ের ইতালিয়ান জেনারেল তেরুজ্জি ওমরকে ব্যতিক্রমধর্মী, অধ্যাবসায়ী এবং কঠোর ইচ্ছাশক্তির অধিকারী বলে বর্ণনা করেন।

১৯২৮ সাল। ধরাশায়ী বেনিতো মুসোলিনি যে কোনো মূল্যে ওমর আল-মুখতারকে গ্রেপ্তার করে লিবিয়ার বিদ্রোহ চূড়ান্তভাবে দমনের জন্য রুডলফ গ্র্যাজিয়ানিকে দায়িত্ব দিয়ে লিবিয়াতে পাঠালেন। গ্র্যাজিয়ানি লিবিয়াতে আসেন এই শর্তে যে, তিনি লিবিয়া শাসনের ব্যাপারে কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন মেনে চলবেন না। বিদ্রোহ দমনের জন্য যা করা প্রয়োজন, তা-ই করবেন।

১৯২৯ সালে শেরিফ আল-গারিয়ানির মধ্যস্থতায় ইতালি কর্তৃক নিযুক্ত লিবিয়ার গভর্নর পিয়েত্রো বাদুলিও ওমর আল-মুখতারের সাথে একটি বৈঠকে বসেন। প্রথমে তিনি তাকে প্রস্তাব দেন যে, যুদ্ধ বন্ধ করলে তাকে সরকারি উচ্চপদে দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ দেওয়া হবে। কিন্তু ওমর রাজি না হওয়ায় তিনি ওমরের সাথে লিবিয়ানদের অনুকূলে যায় এমন কিছু শর্তাবলি সহ শান্তিুচুক্তি স্থাপন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ইতালিয়ানরা এই চুক্তিনামার ধারাগুলো পরিবর্তন করে ফেলে এবং প্রচার করে যে, ওমর আল-মুখতার লিবিয়ার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এ সংবাদ শোনার পর ওমর সমঝোতা চুক্তি বাতিল করেন এবং পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে ফিরে গিয়ে গ্র্যাজিয়ানির বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্ততি গ্রহণ করতে থাকেন।

ওমরের সেনুসি যোদ্ধারা যেন মিসর এবং সুদান থেকে কোনো অস্ত্র সাহায্য না পায়, সেজন্য গ্র্যাজিয়ানি লিবিয়ার সীমান্ত বরাবর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করেন। স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্য বন্ধ করার জন্য তিনি পুরো লিবিয়া জুড়ে বিশাল বিশাল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প স্থাপন করেন এবং জাবাল আল-আখদারের প্রায় সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে এসব ক্যাম্পে স্থানান্তর করেন। প্রচণ্ড অত্যাচারে এবং অনাহারে এসব কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের এক লাখ বন্দীর প্রায় অর্ধেকই মৃত্যুবরণ করে।

গ্রেপ্তার, বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড
====================
ওমর আল-মুখতার প্রতি বছরই অন্তত একবার তার নিজের প্রতিরোধ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে অন্যান্য প্রতিরোধকেন্দ্রগুলোতে যেতেন তাদের অবস্থা পরিদর্শনের জন্য। তাদের সাথে প্রতিবারই শতাধিক যোদ্ধা থাকত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু গ্র্যাজিয়ানির আক্রমণে পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল। তাই ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ৪০ জন সঙ্গী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন ওমর। ১১ সেপ্টেম্বরে তারা যখন আল-বেইদার নিকটবর্তী জাবাল আল-আখাদরের সোলোন্তা নামক এলাকায় একটি খাল পার হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন স্থানীয় আরব দালালদের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ইতালিয়ান বাহিনী তাদেরকে চারদিক থাকে ঘিরে ফেলে এবং তাদের উপর আক্রমণ শুরু করে।

যুদ্ধে ওমর আল-মুখতারের ঘোড়া আহত হলে তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান। উঠে দাঁড়ানোর আগেই এক সৈন্য তাকে দেখে ফেলে। সে ওমরকে চিনতে না পেরে তাকে গুলি করতে উদ্যত হয়, কিন্তু আরেকজন সৈন্য নাম জিজ্ঞেস করলে ওমর যখন নিজের পরিচয় দেন, তখন তারা তাকে ঘিরে ফেলে। যুদ্ধে আহত ৭৩ বছর বয়সী এ বৃদ্ধকে ইতালিয়ানরা হাতে-পায়ে ভারী শিকল পরিয়ে বন্দি করে নিয়ে যায়।

ওমরের বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করার জন্য জেনারেল গ্র্যাজিয়ানি রোম থেকে ছুটে আসেন। তিনি ওমরকে জিজ্ঞেস করেন, তারা আসলেই ইতালির মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করার আশা করত কিনা। উত্তরে ওমর বলেন, “যুদ্ধ করাটা আমাদের কর্তব্য, আর বিজয় আসবে আল্লাহ্‌র কাছ থেকে।

বন্দী ওমর আল-মুখতারকে দেখে ইতালিয়ান কর্মকর্তারা অবাক হয়ে যান। তারা ভেবেছিলেন ওমর হয়তোবা শক্ত-সমর্থ মাঝবয়েসী এক ব্যক্তি। কিন্তু তারা দেখতে পান, যে দুর্ধর্ষ যোদ্ধার হাতে তাদের বিশাল বাহিনী বারবার পর্যুদস্ত হয়েছে, তিনি সত্তোরোর্ধ এক বৃদ্ধ, বার বার যুদ্ধে আঘাত পেয়ে যার শরীর ছিল জর্জরিত, বেশ কিছু হাড় ছিল ভাঙ্গা। কিন্তু তার কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়। জেনারেল গ্র্যাজিয়ানি ওমরের বর্ণনা দেন এভাবে যে, তিনি ছিলেন মাঝারি উচ্চতার, বলিষ্ঠ গড়নের, সাদা চুল এবং দাড়ি-গোঁফ বিশিষ্ট। তার চেহারায় ছিল বুদ্ধিদীপ্ততা, তিনি ছিলেন ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানী। তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী, নিঃস্বার্থ এবং আপোষহীন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনুসি নেতাদের একজন, অথচ অত্যন্ত দরিদ্র।

ইতালিয়ানরা ওমরের জন্য এক প্রহসনমূলক বিচারের আয়োজন করে। মাত্র তিন দিনের মধ্যে তার বিচার সম্পন্ন করে তারা তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। রায় শুনে ওমর আল-মুখতার পবিত্র কুরআন শরিফ থেকে উচ্চারণ করেন, “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহ্‌র জন্য, এবং তার কাছেই আমরা ফিরে যাব।”

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, বুধবার, বেনগাজীর নিকটবর্তী সুলুক শহরে ওমর আল-মুখতারের ফাঁসির আয়োজন করা হয়। লিবিয়ানদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতালিয়ানরা প্রায় ২০,০০০ মানুষকে ফাঁসির ময়দানে উপস্থিত করে। সকাল নয়টার সময় প্রকাশ্য ময়দানে জনসমক্ষে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। শহীদ হন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম এক বীর যোদ্ধা, যিনি পরাজয় নিশ্চিত জেনেও অন্যায়ের কাছে কখনও মাথা নত করেননি। ৭৩ বছর বয়সে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত যিনি লড়ে গেছেন দখলদার বাহিনীর হাত থেকে নিজের দেশকে মুক্ত করার জন্য।

বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব জুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিজ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে কয়জন নেতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বীরদর্পে লড়াই করে গেছেন, তাদের মধ্যে সেনুসী আন্দোলনের নেতা ওমর আ‌ল-মুখতার অন্যতম। অকুতোভয় এই বীর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ইতালিয়ান শাসনের বিরুদ্ধে লিবিয়ান মুজাহিদদের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।