Tuesday , 4 August 2020
শিরোনাম
আজ খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের শুভ জন্মদিন

আজ খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের শুভ জন্মদিন

আজ খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের শুভ জন্মদিন। ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।

সুকুমার রায়কে বলা হয় বাঙালি শিশুসাহিত্যিক ও ভারতীয় সাহিত্যে “ননসেন্স রাইমের” প্রবর্তক। তিনি একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। তিনি ছিলেন জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর সন্তান এবং তার পুত্র খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। তার লেখা কবিতার বই আবোল তাবোল, গল্প হযবরল, গল্প সংকলন পাগলা দাশু, এবং নাটক চলচ্চিত্তচঞ্চরী বিশ্বসাহিত্যে সর্বযুগের সেরা “ননসেন্স” ধরণের ব্যঙ্গাত্মক শিশুসাহিত্যের অন্যতম বলে মনে করা হয়, কেবল অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড (Alice in Wonderland) ইত্যাদি কয়েকটি মুষ্টিমেয় ক্লাসিক-ই যাদের সমকক্ষ। মৃত্যুর বহু বছর পরেও তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম শিশুসাহিত্যিকদের একজন।

মাত্র ছত্রিশ বছর জীবনে তিনি আমাদের শিশু সাহিত্যে এমন অবিস্মরণীয় অবদান সৃষ্টি করে গেছেন যে, তার স্বাদ চির নতুন বলে অনুভব হয়। প্রথম কবিতা ‘মুকুল’ পত্রিকায় প্রকাশ মাত্র ন’বছর বয়সে— নাম ‘নদী’। তারপর ১৩১৩-তে প্রথম গদ্য ‘মুকুলে’, নাম— ‘সূর্যের রাজা’। প্রবাসীতে ১৩১৭ সালে প্রবন্ধ— ‘ভারতীয় চিত্রশিল্প’। ১৯০৮-০৯ সালে তার প্রতিষ্ঠিত ‘ননসেন্স ক্লাবে’র জন্য নাটক রচনা করলেন ‘ঝালাপালা’ ও লক্ষ্মণের শক্তিশেল’।

প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন ১৯০২ সালে, এসময়ে তিনি ব্রাহ্মসমাজের Student Weekly Service-এর সঙ্গে যুক্ত হলেন। এ সময়ে তার সঙ্গে অনেক উৎসাহী সমমনোভাবাপন্ন বন্ধুদের যোগাযোগ ঘটে। ১৯০৬ সালে তিনি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস করলেন। এরপরই তার ‘ননসেন্স ক্লাবে’র কাজকর্ম শুরু হল।

উপেন্দ্রকিশোর সেইসময় তার ছোটদের লেখার পাশাপাশি ‘হাফটোন ফটোগ্রাফ’ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফল করে এনেছিলেন। তিনি চাইলেন এ কাজে সুকুমারের বিজ্ঞান প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তাকে আরো ভালোভাবে কাজে লাগাতে। একারণে তাকে বিলাতে চিত্রমুদ্রণ শিল্প-এর বৈজ্ঞানিক কারিগরি শিক্ষালাভ করতে পাঠালেন। ১৯১১ সালে সুকুমার রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি’ লাভ করে লন্ডনে গেলেন ‘চিত্র-মুদ্রণ বিদ্যা’ শেখবার জন্য। সুকুমারের ফটোগ্রাফ ও অঙ্কনে ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল, ব্রিটেনের ‘Boys own Paper’ পত্রিকায় ফোটোগ্রাফির এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তিনি তৃতীয় স্থান লাভ করেন মাত্র সতেরো বছর বয়সে।

সুকুমার রায়ের জীবনে কবিগুরুর প্রভাব অনেকখানি। যখন রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে গেলেন সুকুমার উচ্চশিক্ষার জন্য সেখানে, তার আবাসস্থল থেকে কবির বাসস্থান খুব কাছেই। এখানেই কবির সঙ্গে তার যোগাযোগ ক্রমশ অন্তরঙ্গতায় পরিণত হল। সুকুমার এই যোগাযোগের বিবরণ বিস্তারিতভাবে তার মা-বাবা ও ঘনিষ্ঠদের চিঠি লিখে নিয়মিতভাবে জানাতেন। প্রায় দিনই কবির বাড়িতে নিমন্ত্রণ থাকত এবং বলাবাহুল্য সেখানে অনেক বিদ্বান ব্যক্তিদের সঙ্গে চলত সাহিত্যের নানা আড্ডা। তিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান/কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন— যা ইংল্যান্ডের গুণীমহলে সমাদৃত হয়েছিল। সেইসঙ্গে কবিও সন্তোষ লাভ করেছিলেন।
সুকুমার রায় উচ্চশিক্ষা থেকে ফিরে এসে রীতিমত শিশু সাহিত্য রচনার কাজে হাত দিলেন। পিতার মৃত্যুর পর ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সমস্ত ভার তার উপর এসে পড়ল। পত্রিকার যে মান পিতা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন, তা বজায় রাখার জন্য সর্বতো প্রচেষ্টা চলল। সত্যিই আমৃত্যু তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে গিয়েছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র’র মন্তব্য অনুসারে— ‘তখনকার কয়েক বছরের ‘সন্দেশ’ পৃথিবীর যে কোনো ভাষার শিশু পত্রিকার সঙ্গে বুঝি পাল্লা দিতে পারত।’

তারপর একে একে যেন দৃশ্যান্তর পর্ব চলতে লাগল— ‘গোঁফচুরি, ‘কাঠবুড়ো’, ‘সৎপাত্র’, ‘গানের গুঁতো’, ‘কুমড়ো পটাশ’ নতুন নতুন রস অসম্ভবকে সবার সামনে ছন্দে ভাষায় ও ছবিতে এনে ফেলা। তার প্রতিটি ছড়ার সঙ্গে তার স্বহস্তে অসাধারণ অঙ্কন চিত্র কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সহায়তা করেছে। এ প্রসঙ্গে আমরা তার সুযোগ্য পুত্র সত্যজিৎ রায়ের লেখায় জানতে পারি— ‘উপেন্দ্রকিশোর বা সুকুমার কেউই আঁকা শেখেননি। উপেন্দ্রকিশোরের কাজে সেটা বোঝার উপায় নেই, কিন্তু সুকুমারের কাজে বোঝা যায়। নিছক অঙ্কন কৌশলে সুকুমার উপেন্দ্রকিশোরের সমকক্ষ ছিলেন না। কিন্তু এই কৌশলের অভাব তিনি (সুকুমার) পূরণ করেছিলেন দু’টি দুর্লভ গুণের দ্বারা। এক হল তার অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, আর দুই হল তার অফুরন্ত কল্পনা শক্তি। এই দুইয়ের সমন্বয়ে তার ছবির বিষয়বস্তু টেকনিককে অতিক্রম করে চোখের সামনে জলজ্যান্ত রূপ ধারণ করে।’

সুকুমার রায়ের নাটকের সংখ্যা আটটি। ননসেন্স ক্লাবের জন্য তিনি নাটক লিখেছেন— যা সদস্যরা সকলে মিলে অভিনয় করতেন। ‘ঝালাপালা’, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’, ‘চলচিত্ত চঞ্চরি’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’— এগুলো আকারে বড় নাটক। এছাড়া ছোট আকারের ‘অবাক জলপান’, ‘হিংসুটে’, ‘ভাবুকসভা’, ‘মামাগো’— এই চারটি নাটক রয়েছে।

মনে হয় সুকুমারের ছড়া বা নাটক নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে তার গল্প, প্রবন্ধ নিয়ে ততটা হয় না। অথচ তার রচনার প্রায় সত্তর ভাগের বেশি অংশ রয়েছে গল্প আর প্রবন্ধ নিয়ে। সত্তরটি গল্প, ষোলটি জীবনী ও একশ আঠাশটি প্রবন্ধ তিনি রচনা করেন— যার মধ্যে দুটো ইংরেজিতে। কিন্তু মনে হয় এর চেয়েও অনেক বেশি তার রচনা সম্ভার, কারণ তিনি লন্ডনে রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতা অনুবাদ করেন, অন্তত দুটো প্রবন্ধ তিনি ওখানে পাঠ করেন, যেগুলোর সন্ধান মেলেনি। তার গল্পের মধ্যে বিখ্যাত ‘হ য ব র ল’, ‘পাগলা দাশু’। তার লেখা বিজ্ঞানের গল্প, জীবনী ও প্রবন্ধগুলো যেন তার বিজ্ঞান প্রতিভাকে মনে করিয়ে দেয়।

‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ আমাদের এক নতুন অ্যাডভেঞ্চারের সন্ধান দেয়। পুত্র সত্যজিতের হাতে পড়ে সে যেন সম্পূর্ণ রূপ পায় ‘প্রোফেসর শঙ্কু’তে। গুপী-বাঘার গল্পও যেন রচয়িতা দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। সুকুমারের প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে বোঝা যায় তার পাণ্ডিত্য কত বহুমুখী ছিল। শুধু ‘ননসেন্স রাইম’ই নয়, তার সাহিত্য প্রতিভা ছিল পিতার মতোই বিচিত্র ও সমৃদ্ধ। তিনি প্রায় চৌত্রিশটি গান লিখেছিলে— যার বেশিরভাগের সুরকার ছিলেন তিনি নিজে।

সুকুমার রায় মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে চলে না গেলে নিশ্চিতভাবে তার কাছে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধি লাভ করত। জীবদ্দশায় যার কোন গ্রন্থই প্রকাশ হয়নি। মৃত্যুর মাত্র ন’দিন পর ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৩, তার প্রথম ছড়ার গ্রন্থ ‘আবোল তাবোল’ প্রকাশিত হয়। তার মৃত্যুর সময় পুত্র সত্যজিতের মাত্র আড়াই বছর বয়স, পরবর্তী জীবনে যিনি পিতার রচনা সম্ভারকে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।